মঙ্গলবার ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ০২:৩০

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন: বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কী বলেছিলেন জিয়া?

Published : 2017-08-15 23:49:00
সকালের খবর ডেস্ক: অন্যান্য দিনের মতোই রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট রাত ৮টা নাগাদ ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে ফেরেন। খাওয়া-দাওয়া শেষে রাত ১২টার মধ্যেই সে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে যায়।
তখন সে বাড়ির নিচতলায় একটি কক্ষে কর্মরত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী এ এফ এম মুহিতুল ইসলাম। রাত ৩টা নাগাদ ঘুমাতে যান তিনি।
এর কিছুক্ষণ পরই সে বাড়িতে টেলিফোনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি মুহিতুল ইসলামকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। কারণ রাষ্ট্রপতি তার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন।
মুহিতুল ইসলাম ২০১৬ সালে মারা যান। ১৯৯৬ সালে তিনি শেখ মুজিব হত্যা মামলার বাদী হয়েছিলেন।
এর আগে ২০১০ সালে বিবিসি বাংলার সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে মুহিতুল ইসলাম বলেন, বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, সেরনিয়াবাত সাহেবের বাসায় আক্রমণ করছে। ওই অবস্থায় আমি পুলিশকে টেলিফোনের চেষ্টা করছিলাম। তারপর বঙ্গবন্ধু ওপর থেকে নিচে নেমে এলেন। গেঞ্জি গায়ে লুঙ্গি পরা। তখন উনি আমাকে বললেন, আমার কাছে দে।
আমার কাছ থেকে তিনি রিসিভারটা নিলেন। নিয়ে বললেন, হ্যালো আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি। উনি একথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই বৃষ্টির মতো গুলি আসা শুরু হল। উনি গাড়ি বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে বললেন, পুলিশ সেন্ট্রি, আর্মি সেন্ট্রি-এত গুলি চলছে তোমরা কী করো? আমিও ওনার পিছু এসে দাঁড়ালাম। উনি একথা বলেই ওপরে উঠে চলে গেলেন। এ গোলাগুলির সময় রাষ্ট্রপতিসহ তাঁর বাড়ির কেউ ঘটনা সম্পর্কে আঁচ করতে পারেননি।
মুহিতুল ইসলাম বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের ছেলে শেখ কামালকে যখন বাড়ির নিচতলায় গুলি করে হত্যা করা হয়, তখন ঘটনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল।
ধানমণ্ডির সে বাড়িতে সশস্ত্র হত্যাকারীরা প্রথমে হত্যা করে শেখ কামালকে। গোলাগুলির আওয়াজ শোনার পর ঘটনা সম্পর্কে জানতে বাড়ির নিচতলায় নেমে আসেন শেখ কামাল।
পাঁচ-ছয় জন আর্মি, কেউ কালো পোশাকধারী, কেউ খাকি পোশাকধারী-ওনার সামনে এসে বলল হ্যান্ডস আপ। কামাল ভাই বলছে, আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল। তখনই সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশফায়ার। গুলিতে বুক ঝাঁঝরা হয়ে মুখ থুবড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন শেখ কামাল।
রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে যখন আক্রমণ হয়, তখন কোনো ধরনের প্রতিরোধ ছাড়াই হত্যাকারীরা পুরো বাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল।
মুহিতুল ইসলাম বলছিলেন, একজন রাষ্ট্রপতির বাড়িতে যে ধরনের নিরাপত্তা থাকা দরকার, সেটি ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে ছিল না। তাছাড়া রাষ্ট্রপতির বাড়িতে আক্রমণের পরও কোনো তরফ থেকে কোনো ধরনের সহায়তা আসেনি।
শেখ কামালকে হত্যার পর হত্যাকারীরা বেপরোয়া গুলি চালিয়ে বাড়ির ওপরের দিকে যাচ্ছিল। ওপরে উঠেই শুরু হয় নির্বিচার হত্যাকাণ্ড। চারিদিকে তখন শুধু গুলির শব্দ।
মুহিতুল ইসলাম বলেন, ওপরে তো তাণ্ডবলীলা চলছে। চারিদিকে একটা বীভত্স অবস্থা। ঠিক সে মুহূর্তে ওপর থেকে চিত্কার শুরু করল যে পাইছি পাইছি। এরপর বঙ্গবন্ধুর একটা কণ্ঠ শুনলাম। তিনি বললেন, তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাস? এরপর ব্রাশফায়ার। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ আমরা আর শুনতে পাইনি।
মুহিতুল ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী ধানমণ্ডির সে বাড়িটিতে সর্বশেষ হত্যা করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ছেলে শেখ রাসেলকে। তখন তার বয়স মাত্র ১০ বছর। এ হত্যাকাণ্ডটি হয়েছিল মুহিতুল ইসলামের সামনে।
তার বর্ণনায়, রাসেল দৌড়ে এসে আমাকে জাপটে ধরে। আমাকে বলল, ভাইয়া আমাকে মারবে না তো? ওর সে কণ্ঠ শুনে আমার চোখ ফেটে পানি এসেছিল। এক ঘাতক এসে আমাকে রাইফেলের বাঁট দিয়ে ভীষণ মারল। আমাকে মারতে দেখে রাসেল আমাকে ছেড়ে দিল। ও (শেখ রাসেল) কান্নাকাটি করছিল যে, ‘আমি মায়ের কাছে যাব, আমি মায়ের কাছে যাব’। এক ঘাতক এসে ওকে বলল, ‘চল তোর মায়ের কাছে দিয়ে আসি’। বিশ্বাস করতে পারিনি যে ঘাতকরা এত নির্মমভাবে ছোট্ট সে শিশুটাকেও হত্যা করবে। রাসেলকে ভেতরে নিয়ে গেল এবং তারপর ব্রাশফায়ার।
রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সব সদস্যকে হত্যার পর ঘাতকরা একে অপরকে বলছিল, “অল আর ফিনিশড (সবাই শেষ)।
সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা। সে সময় ঢাকা সেনানিবাসে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন আমিন আহমেদ চৌধুরী, যিনি পরে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন। তিনি ২০১৩ সালে মারা যান।
২০১০ সালে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি জানিয়েছেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর ৫টার দিকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত মেজর রশিদের নেতৃত্বে একদল সেনা তার বাড়ি ঘিরে ফেলে।
আমিন আহমেদ চৌধুরী তখনও জানতেন না যে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। মেজর রশিদের নেতৃত্বে সৈন্যরা আমিন আহমেদ চৌধুরী এবং তত্কালীন কর্নেল শাফায়াত জামিলকে নিয়ে যায় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাড়িতে। জেনারেল জিয়া তখন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান।
জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাড়িতে ঢোকার সময় রেডিওর মাধ্যমে আমিন আহমেদ চৌধুরী জানতে পারেন, রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে।
“জেনারেল জিয়া একদিকে শেভ করছেন, একদিকে শেভ করে নাই। স্লিপিং স্যুটে দৌড়ে এলেন। শাফায়াতকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘শাফায়াত কী হয়েছে?’ শাফায়াত বললেন, ‘অ্যাপারেন্টলি দুই ব্যাটালিয়ন স্টেজ এ ক্যু। বাইরে কী হয়েছে এখনও আমরা কিছু জানি না। রেডিওতে অ্যানাউন্সমেন্ট শুনতেছি প্রেসিডেন্ট মারা গেছেন।’ তখন জেনারেল জিয়া বললেন, সো হোয়াট? লেট ভাইস প্রেসিডেন্ট টেক ওভার। উই হ্যাভ নাথিং টু ডু উইথ পলিটিক্স।
সেনানিবাসের দুটি ব্যাটালিয়ন এ অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত থাকলেও পুরো সেনাবাহিনী সেটার পক্ষে ছিল না বলে উল্লেখ করেন আমিন আহমেদ চৌধুরী। ঢাকা সেনানিবাসে যখন এ অভ্যুত্থানের খবর ছড়িয়েছে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
এ অভ্যুত্থান পরিকল্পনার খবর কেন আগে জানা সম্ভব হয়নি এবং কেন সেনাবাহিনীর অন্য কোনো ইউনিট এগিয়ে আসেনি সেটি আজও এক বিরাট প্রশ্ন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আক্রমণের সময় শেখ মুজিবুর রহমান তার সামরিক সচিব কর্নেল জামিল উদ্দিনকে ফোন করে তার বাড়িতে আক্রমণের কথা জানিয়েছিলেন।
কর্নেল জামিল তখন সঙ্গে সঙ্গে রওনা হয়েছিলেন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ির দিকে। কিন্তু সোবহানবাগ মসজিদের কাছে পৌঁছলে তার গাড়ি রোধ করে অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত সৈন্যরা। সে বাধা উপেক্ষা করে কর্নেল জামিল সামনে এগিয়ে যেতে চাইলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত সেনাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
সকাল ১০টার দিকে আমিন আহমেদ চৌধুরী গিয়েছিলেন সে বাড়িতে। ভোর সাড়ে ৪টা নাগাদ হত্যাকাণ্ড হলেও তখন সেখানে মৃতদেহ দেখেছেন তিনি। সামরিক পোশাক পরা অবস্থায় চৌধুরী সেখানে গেলেও তাকে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছিল না সৈন্যরা।
চৌধুরীর বর্ণনা ছিল এ রকম”আর্টিলারি রেজিমেন্টের কিছু ট্রুপস ছিল সেখানে। মেজর হুদা ছিলেন। আমি যে যেহেতু হুদাকে চিনতাম, তাকে বলার পর সে আমাকে ঢুকতে দেয়। আমি দোতলার সিঁড়িতে উঠতেই বঙ্গবন্ধুর লাশটা দেখি। তার চশমা ও পাইপটাও পড়ে ছিল। দূর থেকে ভেতরে দেখলাম বেগম মুজিব পড়ে আছেন। যে লোকটার অঙ্গুলি হেলনে পঁচাত্তর মিলিয়ন লোক উঠছে-বসছে, সে লোকটাকে তার সৃষ্ট আর্মি মেরে ফেলল। এটা কী করে সম্ভব? পাকিস্তানিদের কাছে মারা যায় নাই, মারা গেল শেষ পর্যন্ত বাঙালির কাছে।
সে অভ্যুত্থানের পর অনেকে তাকিয়ে ছিলেন তত্কালীন রক্ষীবাহিনীর প্রতিক্রিয়ার দিকে।
সেনাবাহিনীর সঙ্গে রক্ষীবাহিনীর কোনো সংঘাত তৈরি হয় কি না সেটি নিয়েও অনেকে উদ্বিগ্ন ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে ধরনের কিছু ঘটেনি। রক্ষীবাহিনীর দিক থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না হওয়ায় অনেকে অবাক হয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর উল্টো রক্ষীবাহিনী আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল বলে জানান আমিন আহমেদ চৌধুরী।
ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে আমিন আহমেদ চৌধুরী দুপুর নাগাদ পৌঁছেন সাভারে অবস্থিত রক্ষীবাহিনীর সদর দফতরে।
চৌধুরীর দায়িত্ব ছিল রক্ষীবাহিনী যাতে আতঙ্কগ্রস্ত না হয় সে বার্তা তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
আমিন চৌধুরী বলেন, আমি সেখানে গিয়ে বলি, সেনাবাহিনীর কিছু লোক এটার (হত্যাকাণ্ড) সঙ্গে জড়িত থাকলেও পুরো সেনাবাহিনী এর সঙ্গে জড়িত নয়। সে হিসেবে সেনাপ্রধানের বাণী নিয়ে আমি এখানে আসছি।
হত্যাকাণ্ডের পর তত্কালীন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্য খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
সামগ্রিকভাবে ১৫ আগস্ট সারাদিন সেনাবাহিনীর ভেতর থেকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। অভ্যুত্থানের খবর জানাজানি হওয়ার পর সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যেই এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন আমিন আহমেদ চৌধুরী।
তিনি জানান, ঘটনার আকস্মিকতায় অনেকে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। কী করতে হবে তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না।
চৌধুরীর বর্ণনায়”যখন সকাল হয়ে গেছে তখন দেখা যাচ্ছে কোনো পলিটিক্যাল ডিরেকশন আসতেছে না। বঙ্গবন্ধু মারা গেছে, এখন আমরা কী করব? কার পেছনে দাঁড়াব? তারা তো খন্দকার মোশতাককে বসিয়ে দিয়েছে। আমরা এখন তাকে ডিজলস (ক্ষমতাচ্যুত) করব? এর বিরুদ্ধে গেলে পুরোপুরি যুদ্ধ করতে হবে। কারণ ওরা ট্যাংক বের করে অলরেডি বঙ্গভবনে বসে গেছে, ফার্মগেটের সামনে বসে গেছে, জাহাঙ্গীর গেটের ভেতরে অলরেডি মুভ করছে। পরিস্থিতি অ্যাসেস করতে হচ্ছে। আমরা কী পারব? আমাকে তো জানতে হবে আমার কাছে কত সৈন্য আছে এবং কত অ্যামুনিশন আছে।
খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হলেও ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত ঘাতক জুনিয়র সেনা কর্মকর্তারা। সে থেকে পরবর্তী প্রায় ১৫ বছর বাংলাদেশের ইতিহাস সেনাবাহিনীর ভেতরে অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং সামরিক শাসনের ইতিহাস।