মঙ্গলবার ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮, সকাল ০৮:০৩

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের দায়মুক্তি : ইতিহাসের কলঙ্ক

Published : 2017-08-15 22:33:00, Updated : 2017-08-16 10:52:48
ড. এম এ মাননান: ১৫ আগস্ট। বাংলার আকাশ-বাতাস আর প্রকৃতির অশ্রুসিক্ত হওয়ার দিন। বাঙালি জাতির ইতিহাসে শোকের অধ্যায় রচিত হয়েছিল এদিন। ১৯৭৫-এর এই দিনে আগস্ট আর শ্রাবণ মিলেমিশে একাকার হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ত আর আকাশের মর্মছেঁড়া অশ্রুর প্লাবনে। সুবহে সাদিকের সময় যখন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে নিজ বাসভবনে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে বুলেটের বৃষ্টিতে ঘাতকরা ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল, তা যেন ছিল প্রকৃতির অশ্রুপাত। ভেজা ভারি বাতাস কেঁদেছে সমগ্র বাংলায়। ঘাতকের উদ্ধত অস্ত্রের মুখে ভীতসন্ত্রস্ত বাংলাদেশ বিহ্বল হয়ে পড়েছিল শোকে আর অভাবিত ঘটনার আকস্মিকতায়।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে একের পর এক ষড়যন্ত্র চালিয়ে গেছে পরাজিত অপশক্তি। পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তারা চক্রান্তের ফাঁদ পেতেছিল বহুবার। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর বিপথগামী উচ্চাভিলাষী কয়েকজন সদস্যকে ষড়যন্ত্রকারীরা ব্যবহার করেছে এই চক্রান্তের বাস্তব রূপ দিতে। ভোররাতে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করে বিপথগামীরা। মুক্তি পায়নি ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলও। পরের ইতিহাস আরও কষ্টের, বেদনাবিধুর। বঙ্গবন্ধুর নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড জাতির জন্য করুণ বিয়োগগাথা হলেও ভয়ঙ্কর এ হত্যাকাণ্ডে খুনিদের শাস্তি নিশ্চিত না করে বরং দীর্ঘ সময় ধরে তাদের আড়াল করার অপচেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি তারা পুরস্কৃত হয়েছে নানাভাবে। ১৯৭৬ সালের ৮ জুন হত্যাকারীদের ১২ জনকে চীন, পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়েছিল খন্দকার মোশতাক গং। এই সেই মোশতাক, যাকে বঙ্গবন্ধু একান্ত আপনজন ভেবে অতি বিশ্বাস নিয়ে বানিয়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর মোশতাক নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দেন। স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি এই মোশতাকই খুনিদের বাঁচানোর জন্য একই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাত্র ৪২ দিন পর, দায়মুক্তি অধ্যাদেশ (ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স) জারি করেন। দিনটি ছিল শুক্রবার। ‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ লেখা অধ্যাদেশটিতে খন্দকার মোশতাকের স্বাক্ষরের পর তত্কালীন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এইচ রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে। এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদেরকে সকল প্রকার হত্যার দায় থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। অর্থাত্ চক্রান্তকারী/হত্যাকারীদেরকে আদালতে বিচার করা যাবে না। অধ্যাদেশটিতে দুটি ভাগ আছে। প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবত্ আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন এ ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। দ্বিতীয় অংশে বলা আছে, উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে রাষ্ট্রপতি যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হল। অর্থাত্ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। অবশ্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে মোশতাক কোনো হত্যাকারীকে ‘দায়মুক্তি সনদ’ দিয়েছিলেন কি না, এ বিষয়টি এখনও অজ্ঞাত রয়েছে।
অধ্যাদেশটি গেজেটে প্রকাশ করা হলেও গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়নি। ভয় ছিল, জনগণ জেনে গেলে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। বিষয়টি ভালোভাবে জানাজানি হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে হত্যাকারীদেরকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে তাদেরকে সুরক্ষা দেওয়া হয়। লক্ষণীয় যে, মোশতাক হত্যাকারীদের বিচার করবেন এটা যেমন কেউই ভাবেনি, তেমনি তিনি তাদেরকে অফিসিয়ালি ক্ষমার ব্যবস্থা করে দেবেন, এমনটিও অনেকে আশা করেনি। ৮৩ দিনের রাজত্বকালে মোশতাক জাতীয় চার নেতাকে জেলখানার ভেতরে নির্মমভাবে হত্যাসহ যেসব ঘৃণ্য কাজ করেছিলেন তন্মধ্যে অন্যতম ছিল ফারুক ও রশিদকে হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন পরই মেজর থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি দেওয়া এবং ১৯৭৫-এর ৩ অক্টোবর বেতার ভাষণে ফারুক ও রশিদকে সশস্ত্র বাহিনীর ‘সূর্যসন্তান’ নামে অভিহিত করা। এসব করে তিনি নিজেই বাংলার জনগণের কাছে ধিকৃত হয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হন। তার এসব কাজে প্রশাসনের উচ্চস্তরের কর্তাব্যক্তিরা যারা সহায়তা করে বাংলার জনগণের সঙ্গে বেইমানি করেছে, তাদেরকেও পরে ইতিহাস ক্ষমা করেনি।
এরপর ক্ষমতায় আসে আরেক সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের অধীনে নীলনকশার ছক এঁকে প্রহসনমূলক দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন দখল করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে যান এবং সময়-সুযোগমতো তিনি বিএনপি নামক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট (সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দিন) থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেয়। পঞ্চম সংশোধনীর ফলে ‘দায়মুক্তি অধ্যাদেশ’ বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। তাদের কূটকৌশল তারা ঠিকমতোই কাজে লাগায়। এমনকি সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে এমন সব শব্দ যোগ করিয়ে নিয়েছেন, যার মাধ্যমে ২৪ বছরের লাগাতার জনগণের সংগ্রামকে অবহেলায় দূরে ঠেলে দিয়ে ‘সেনাবাহিনী ফ্যাক্টর’কে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অপচেষ্টা করেছেন। শাসনতন্ত্রের ভূমিকায় ‘যরংঃড়ত্রপ ংঃত্ঁমমষব ভড়ত্ হধঃরড়হধষ ষরনবত্ধঃরড়হ’ কথার পরিবর্তে ‘যরংঃড়ত্রপ ধিত্ ভড়ত্ হধঃরড়হধষ রহফবঢ়বহফবহপব’ যোগ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে দেশের সকলেই জড়িত ছিলেন-ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, জনতা, আপামর জনসাধারণ, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনৈতিক দল, পুলিশ, ইপিআর, সেনাসদস্য অনেকেই।  ‘সংগ্রাম’ (ংঃত্ঁমমষব)-এর পরিবর্তে শুধু ‘যুদ্ধ’ (ধিত্) শব্দটি ব্যবহার করে পাকিস্তানিদের ঔপনিবেশিকতা ও বঞ্চনা-দস্যুতার বিরুদ্ধে দুই যুগব্যাপী সর্বসাধারণের সংগ্রাম করার বিষয়টিকে দৃষ্টির আড়ালে নিয়ে যাওয়ার অপপ্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়। জনগণের দীর্ঘদিনের ‘সংগ্রাম’-এর চেতনাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার এই অপচেষ্টাকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাই ধিক্কার জানিয়েছে এবং পরবর্তী প্রজন্মও চিরকাল ঘৃণা জানাতে থাকবে।   
ইনডেমনিটি অধ্যাদেশে যা বলা হয়েছিল, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হইতে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল তারিখের (উভয় দিনসহ) মধ্যে প্রণীত সকল ফরমান, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ ও অন্যান্য আইন এবং উক্ত মেয়াদের মধ্যে অনুরূপ কোনো ফরমান দ্বারা এই সংবিধানের যে সকল সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন ও বিলোপসাধন করা হইয়াছে তাহা, এবং অনুরূপ কোনো ফরমান, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ বা অন্য কোনো আইন হইতে আহরিত বা আহরিত বলিয়া বিবেচিত ক্ষমতাবলে অথবা অনুরূপ কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে গিয়া বা অনুরূপ বিবেচনায় কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত কোনো আদেশ কিংবা প্রদত্ত কোনো দণ্ডাদেশ কার্যকর বা পালন করিবার জন্য উক্ত মেয়াদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আদেশ, কৃত কাজকর্ম, গৃহীত ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ, অথবা প্রণীত, কৃত বা গৃহীত বলিয়া বিবেচিত আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং ঐ সকল আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ বৈধভাবে প্রণীত, কৃত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল এবং তত্সম্পর্কে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট কোনো কারণেই কোনো অভিযোগ উত্থাপন করা যাইবে না।’
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ-অনুগত জাতীয় চার নেতাকে (তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামান; যাঁরা মুজিবনগর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন) নৃশংসভাবে হত্যার লোক দেখানো তদন্ত কমিটি গঠন করেন খন্দকার মোশতাক। পরে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে এ দেশের ইতিহাসে বর্বরতম হত্যার তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত করে দেন এবং খুনিদের দেশ থেকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করার পাশাপাশি কূটনৈতিক দায়িত্ব প্রদান করেন, যা লন্ডনে গঠিত তদন্ত কমিশনের রিপোর্টেও বলা হয়েছে। এসব হত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন ও বিচারের প্রক্রিয়াকে যে সমস্ত কারণ বাধাগ্রস্ত করেছে সেগুলোর তদন্ত করার জন্য ১৯৮০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এই তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। তবে সেই সময়ে বাংলাদেশ সরকারের অসহযোগিতার কারণে এবং কমিশনের এক সদস্যকে ভিসা প্রদান না করায় এ উদ্যোগটি আলোর মুখ দেখেনি। সে সময়ে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ছিলেন জিয়াউর রহমান।
অধ্যাপক আবু সাইয়িদের ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ফ্যাক্টস অ্যান্ড ডকুমেন্টস’ গ্রন্থে এই কমিশন গঠনের বর্ণনা রয়েছে। এতে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, মনসুর আলীর পুত্র মোহাম্মদ সেলিম এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামের পুত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আবেদনক্রমে স্যার থমাস উইলিয়ামস, কিউ. সি. এমপির নেতৃত্বে এই কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ও বিদেশে অনুষ্ঠিত জনসভাগুলোতে এ আবেদনটি ব্যাপকভাবে সমর্থিত হয়। ১৯৮০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর স্যার থমাস উইলিয়ামসের সভাপতিত্বে হাউস অব কমন্সের একটি কমিটি কক্ষে এর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেফ্রি থমাস এবং সলিসিটর অ্যাব্রো রোজ এ সভায় উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ছেড়ে ব্যাঙ্কক পালিয়ে যাওয়ার জন্য সামরিক বাহিনীর যেসব ব্যক্তি আলাপ-আলোচনা চালিয়েছিলেন তাদের তালিকা থেকে জড়িত অফিসারদের শনাক্ত করার কথা বলা হয়। পলায়নকারী ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন লে. কর্নেল ফারুক, লে. কর্নেল আবদুর রশিদ, মেজর শরিফুল হক ডালিম। আপাতদৃষ্টিতে অভ্যুত্থানের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় লে. কর্নেল ফারুক, লে. কর্নেল রশিদ ও মেজর শরিফুল হক ডালিমকে। এর আগে ১৯৭৬ সালের ৩০ আগস্ট লন্ডন সানডে টাইম্স পত্রিকায় বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের সদস্য এবং জেলখানায় ৪ নেতার হত্যার দায় স্বীকার করে কর্নেল ফারুকের একটি সাক্ষাত্কার আমলে নিয়ে তদন্ত কমিশনের একজন সদস্য সন ম্যাকব্রাইডের নেতৃত্বে ১৯৭৭ সালের এপ্রিলে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মিশন বাংলাদেশ পরিদর্শন করে এবং রাষ্ট্রপতিসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার সময় জেলহত্যা সম্পর্কে আলোচনা করে। তখন তাদের বলা হয়, আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া হবে।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর বা তার কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশ থেকে ব্যাঙ্ককে পালিয়ে যাওয়া হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের কূটনৈতিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনা ও বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়, আইন ও বিচারের প্রক্রিয়া স্বীয় গতিতে চলার পথে কী অন্তরায় রয়েছে সে সম্পর্কে সরেজমিন তদন্তের উদ্দেশ্যে কমিশনের একজন সদস্যের ঢাকা সফর করা আবশ্যক। সিদ্ধান্ত হয়, কমিশনের সদস্য জেফ্রি থমাস কিউসি একজন সাহায্যকারীসহ সরেজমিন তদন্ত অনুষ্ঠানের জন্য ১৯৮১ সালের ১৩ জানুয়ারি ঢাকা যাবেন। তারা এ লক্ষ্যে ঢাকা গমনের ভিসা লাভের জন্য তদন্ত কমিশনের সচিব ও সলিসিটর অ্যাব্রো রোজের মাধ্যমে দরখাস্ত পেশ করেন। বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে সময়মতো ভিসা প্রদান করা হবে বলা হয়। অনেক রশি টানাটানির পর একসময় লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন জানিয়ে দেয়, তারা জেফ্রি থমাসের ঢাকা ভ্রমণের জন্য ভিসা দিতে রাজি নয়। ভিসা না দেওয়ায় কমিশন এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, আইন ও বিচারের প্রক্রিয়া স্বীয় গতিতে চলতে দেওয়া হয়নি এবং প্রক্রিয়াটিতে বাধা সৃষ্টি করার জন্য তত্কালীন জিয়াউর রহমানের সরকারকেই দায়ী করা হয়। একের পর এক চক্রান্ত আর অসহযোগিতার কারণে কমিশন তার কাজ এগিয়ে নিতে হোঁচট খায় বারবার। দেশে ও দেশের বাইরে উঠে সমালোচনার ঝড়। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের প্রতি এ দেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় একটুও চিড় ধরাতে পারেনি তারা। ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সমাবেশে অংশ নেন। বিশাল সংবর্ধনায় ভাষণদানকালে শেখ হাসিনা ইনডেমনিটির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘আমি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডসহ পরবর্তীকালে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। বিচার চাই জনগণের কাছে, আপনাদের কাছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার বিচার করবে না। ওদের কাছে বিচার চাইব না। আপনারা আমার সঙ্গে ওয়াদা করুন, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য নেতার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করব।’
২১ বছর পর অর্থাত্ ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর দায়মুক্তি আইন বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার। ১৯৯৬ সালের ২১ নং আইনে বলা হয়-‘এই আইন বলবত্ হইবার পূর্বে যেকোনো সময় উক্ত ঙত্ফরহধহপব-এর অধীনকৃত কোনো কার্য, গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, প্রদত্ত কোনো সার্টিফিকেট বা আদেশ-নির্দেশ অথবা অর্জিত কোনো অধিকার বা সুযোগ-সুবিধা, অথবা সরকার বা কোনো কর্তৃপক্ষের জন্য সৃষ্ট কোনো দায়দায়িত্ব যদি থাকে, এর ক্ষেত্রে বেহবত্ধষ ঈষধঁংবং অপঃ, ১৮৯৭ (ঢ ড়ভ ১৮৯৭) এর ঝবপঃরড়হ ৬ এর বিধানাবলি প্রযোজ্য হইবে না এবং উক্তরূপ কৃত কার্য, গৃহীত ব্যবস্থা, প্রদত্ত সার্টিফিকেট বা আদেশ-নির্দেশ বা অর্জিত অধিকার বা সুযোগ-সুবিধা বা সৃষ্ট দায়দায়িত্ব উপধারা (১) দ্বারা উক্ত ঙত্ফরহধহপব রহিতকরণের সংগে সংগে এইরূপে অকার্যকর, বাতিল ও বিলুপ্ত হইয়া যাইবে যেন উক্ত ঙত্ফরহধহপব জারি করা হয় নাই এবং উক্ত ঙত্ফরহধহপব এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না ও নাই।’
একই বছরের ২ অক্টোবর ধানমণ্ডি থানায় বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী মুহিতুল ইসলাম। এরপর পুরোটাই ইতিহাস। পলাতক খুনিদের কয়েকজনকে দেশে ফিরিয়ে এনে কাঠগড়ায় ফাঁসির মুখোমুখি করা হয়। নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি মৃত্যুদণ্ড রায়প্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ ও মহিউদ্দিন আহমেদসহ পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর হয়। হত্যাকারী-আসামিদের কয়েকজন এখনও পলাতক। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলমান।
মোশতাক-জিয়াদের চক্রান্তে জারিকৃত সেদিনের ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ খুনিদের সাময়িক স্বস্তি দিয়েছিল বটে কিন্তু বিচার থেকে মুক্তি দিতে পারেনি। কোনোদিন পারবেও না। তাই দায়মুক্তি অধ্যাদেশকে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অমোচনীয় কলঙ্ক হিসেবে মনে রাখবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। ধিক্কার দেবে তারা চক্রান্তের হোতাদেরকে।
লেখক : উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়