মঙ্গলবার ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮, দুপুর ০২:১১

পানি যখন রাস্তায়

Published : 2017-08-15 22:32:00
পঞ্চানন মল্লিক: রাস্তায় হাঁটু কিংবা কোথাও কোথাও গলাসমান পানি; জলমগ্ন গাড়ি, মোটরসাইকেল, রিকশার বসার সিটে, ডুবু ডুবু ভ্যানে দাঁড়ানো যাত্রী, পত্রপত্রিকার ছবিতে বা বাস্তবে দেখছি অহরহ। কখনও কখনও রাস্তায় চলছে নৌকাও। এ যেন সুকুমার রায়ের উল্টো রাজার দেশ। আসলে রাস্তাঘাটে জলাবদ্ধতা এখন মানুষের জন্য এক বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিচ্ছে। লোকজনের চলাচলে যেমন সমস্যা হচ্ছে, তেমনি বাড়ি থেকে বের হওয়াও মুশকিল হয়ে পড়ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়ছে মানুষ। জলের অভিশাপে ধুঁকছে সর্বদাই।
রাজধানী ঢাকার চিত্র সবচেয়ে বেশি নাজুক। একবার বৃষ্টি হলে পানি দীর্ঘ সময় জমে থাকায় দেখা দিচ্ছে বিড়ম্বনা। শহরে কর্মের তাগিদে প্রতিদিন মানুষকে ছুটে চলতে হয় এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। যাতায়াত করতে হয় অফিস-আদালতে। পরিবহন করতে হয় নানা জিনিসপত্র ও পণ্যসামগ্রীর। তাছাড়া ব্যাপক সংখ্যক লোককে রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশা, টেম্পো, মাইক্রো কার, স্কুটারসহ বিভিন্ন যানবাহন চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। জমে থাকা পানিতে অসুবিধা হচ্ছে সবারই। এ ব্যাপারে অনেকে দায়ী করছেন ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে। কেউ কেউ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অকার্যকারিতাই মূল কারণ বলে ভাবছেন। এছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর উন্নয়ন কাজে পরস্পর সমন্বয়হীনতা, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা, পলিথিন ও ময়লা-আবর্জনা জমে ড্রেন বা পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া, বর্ষা মৌসুমে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ফ্লাইওভার নির্মাণ, অতিবৃষ্টি, অধিক ঘনবসতি ইত্যাদি উঠে আসছে কারণের তালিকায়। কিন্তু এগুলোকে মূল কারণ বলা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত। সঙ্কীর্ণ, অপরিকল্পিত, অপর্যাপ্ত, অদূরদর্শিতার ফল ইত্যাদি বলে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের গায়ে যতই কাদা লেপুন না কেন, মূল রোগ কি ল্যাবরেটরিতে ধরা পড়ছে? সরু ড্রেন তো অতীতেও ছিল, তখন কি এমন যবুথবু ডুবেছে নগর? তখন ঢাকার প্রশস্ত খালগুলো ছিল বর্ষায় পানি ধারণের উপযুক্ত আধার। খাল দিয়ে পানি গিয়ে পড়ত বুড়িগঙ্গায়। খাল ও এর শাখা-প্রশাখা ছিল জালের মতো বিস্তৃত। কোথায় গেল সেসব খাল? আমরাই মেরে ফেলেছি, দখল করেছি। এখন সেখানে নির্মিত হয়েছে সঙ্কীর্ণ বক্স কালভার্ট। যার পেটে প্রতিনিয়ত ময়লা-আবর্জনার চর্বি জমে বন্ধ হচ্ছে প্রবাহ। তাহলে শুধু শুধু সঙ্কীর্ণ ড্রেনেজ ব্যবস্থার গায়ে একতরফা দোষ চাপানোইবা কেন?
ধরে নিলাম সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে অলিগলিতে গভীর ও প্রশস্ত ড্রেনসমূহ তৈরি করা হল, কিন্তু ভাবেন তো ড্রেন বেয়ে জল গিয়ে দাঁড়াবে কোথায়? ঢাকার আশপাশের নদ-নদী কি আগের মতো সেই গভীরতায় আছে? বুড়িগঙ্গা বুড়ি হয়েছে সেই কবে। দখলে, দূষণে ছেয়ে গেছে শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু, বুড়িগঙ্গার বুক, লুট হয়েছে অবয়ব। আমরা কি একবার ভেবেছি এর পরিণাম কী হতে পারে? এগুলো শহরের জন্য পানিবদ্ধতার কতটা কারণ হতে পারে! আমাদের ভালো-মন্দের ব্যাপারে আমরাই যদি সচেতন না হই, আকাশ থেকে দৈত্য এসে তো আর আমাদের সব সমস্যার সমাধান করে দেবে না। আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ হয়তো কেউ পেয়েছিল, কিন্তু আমরা তো প্রদীপ নেভাতে ওস্তাদ। যদি তাই না হবে তাহলে আমরা কেন নদী-নালা, খাল-বিল এভাবে হত্যা করছি? নদী না থাকলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা পাবে? নদীর প্রাণবায়ু ফুরালে হুমকির সম্মুখীন হবে আমাদের অস্তিত্ব। নদী ভরাটের দুটি কারণের একটি হল মনুষ্যসৃষ্ট, অন্যটি প্রাকৃতিক। প্রাকৃতিক কিছু কারণে এবং ভারত কর্তৃক ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের ফলে এদেশে ব্যাপকভাবে নদী-নালা ভরাট হচ্ছে, সেটাও ঠিক। কিন্তু ভরাট হওয়া নদী পুনঃখননের উদ্যোগ না নিয়ে সেগুলো হরিলুটের মতো দখল কোন ধরনের বর্বরতা? এটি কি আমাদের পরিবেশ ও জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করবে না? নিশ্চয়ই করবে। এর ফল আমরা ইতোমধ্যে টের পাচ্ছি।
রাজধানীর মতো সারাদেশ আজ পানিতে নিমজ্জিত হচ্ছে। বৃহত্তর যশোর অঞ্চলে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ সেখানকার ভবদাহ সমস্যা। এলাকার পানি সরবরাহের প্রধান পথ ভবদাহ স্লুইসগেটটি বারবার পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে অভয়নগর, কেশবপুর, মনিরামপুর উপজেলাসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় প্রতি বছরই স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। পানির উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে চট্টগ্রাম শহর প্রায়ই জোয়ারের পানিতে নিমজ্জিত হতে দেখা যায়। এমন ঘটনার যদি প্রতি বছর পুনরাবৃত্তি ঘটে তাহলে ভবিষ্যতে কী হবে আমাদের পরিণতি, তা কি ভেবে দেখেছেন একবার?
হ্যাঁ, বিষয়টি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। আমরা আমাদের নিজেদের পায়ে কুড়াল মারতে পারি না। নদী-নালা ধ্বংস করলে তা হবে আমাদের জন্য আত্মহননের শামিল। তাই নদীকে ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে সর্বাগ্রে। বিলুপ্ত বা হারিয়ে নদ-নদী, খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদী খনন করতে হবে। ময়লা-আবর্জনা, দূষিত পদার্থ ইত্যাদি দ্বারা যেন নদী ভরাট না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। আর তা না হলে জলজটে শুধু শহরের পথচারী নয়, পস্তাবে সারাদেশ।