বুধবার ২৪ জানুয়ারি, ২০১৮, বিকাল ০৩:৪৭
ব্রেকিং নিউজ

■  পশুখাদ্য মামলায় ফের ৫ বছরের কারাদ্ণ্ড লালুপ্রসাদের ■  আ.লীগ ৪০টির বেশি আসন পাবে না : জানালেন মোশাররফ ■  নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া নির্বাচন হবে না: হুশিয়ারি ফখরুলের ■  ২৯ জানুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট ডেকেছে প্রগতিশীল ছাত্রজোট ■  চবিতে প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্যের মিছিলে ছাত্রলীগের হামলা ■  ঢাবি উপাচার্যকে হেনস্তার ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি ■  আফগানিস্তানে ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ কার্যালয়ে হামলা, আহত ১১ ■  ঢাবিতে অরাজকতা হতে দেওয়া হবে না: হুশিয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ■  ভিসির কার্যালয়ে গেট ভাঙ্গার বিচার হবে: কাদের ■  জয়নাব ধর্ষণ ও হত্যার মূল সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার ■  সেনাপ্রধানের বাবা শরিফুল হকের ইন্তেকাল ■  ভেনেজুয়েলায় আগাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঘোষণা ■  কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে : প্রধানমন্ত্রী

কোটার মরণ ফাঁদ

Published : 2017-08-11 00:06:00
মোহাম্মদ অংকন: দেশে সরকারি চাকরিতে বেশিরভাগ মেধাবী ও কর্মঠদের ‘কোটার ফাঁদে’ পড়তে হচ্ছে। এ থেকে উত্তরণে সরকারের দৃশ্যমান কোনো রকম মাথাব্যথা নেই। বরং প্রতিনিয়ত কোটা নামক ফাঁদের খোপ বাড়িয়ে চলেছে। কোটা পদ্ধতির বিষাক্ত ছোবলে মেধাবীদের সরকারি চাকরি পাওয়া অত্যন্ত জটিল, দুরূহ ও সময় সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে শতভাগ নিখুঁতভাবে উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচন প্রায় অসম্ভব। এটা একপ্রকার মেধার অবমূল্যায়ন, যা বিশ্বের খুব কম দেশেই দেখা যায়।
বর্তমানে আমাদের দেশে মুক্তিযোদ্ধার ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনি, নারী, জেলা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী (উপজাতি), প্রতিবন্ধী, আনসার ও ভিডিপি, পোষ্য, খেলোয়াড় ও এলাকাসহ প্রায় ২৫৭ ধরনের কোটা প্রচলিত রয়েছে। এসব কোটা বিসিএস, সরকারি চাকরি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি ও ভর্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিসিএসে মেধা তালিকা থেকে মাত্র ৪৫ শতাংশ নিয়োগ দেওয়া হয়। আর বাকি ৫৫ শতাংশ কোটায় সুযোগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩০, মহিলা ১০, জেলা ১০ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ রয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে কোটা পুরোপুরি পূরণ না হলে ১ শতাংশ প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। এছাড়া নন-ক্যাডার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও কোটা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণর সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মেধা তালিকা থেকে মাত্র ৩০ শতাংশ এবং কোটা থেকে বাকি ৭০ শতাংশ পূরণ করা হয়। শুধু বিসিএস ও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেই নয়, প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পর্যন্ত কোটা পদ্ধতি চালু রয়েছে। দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি চাকরি লাভের ক্ষেত্রে ‘কোটা’ পদ্ধতির ব্যাপকতায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মেধাবী ঝরে পড়ছে। মেধাবীরা পরীক্ষায় ভালো ফল করেও কোটার কারণে সরকারি চাকরি ও ভর্তিতে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের কাছে হেরে যাচ্ছে। বলা যায়, কোটার ফাঁদ মেধাকে বেআইনিভাবে বন্দি করে রাখছে।
উপমহাদেশে ব্রিটিশ আমলে কোটা পদ্ধতির প্রচলন শুরু হয়। তত্কালীন ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে ব্রিটিশদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারায় ভারতীয়দের জন্য কোটা পদ্ধতি চালু করা হয়। তবে পরবর্তীতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের জন্য কিছু কোটা সংরক্ষণ করা হয়। পাকিস্তান আমলে পিছিয়ে পড়া পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) দাবির মুখে কেন্দ্রীয় সুপিরিয়র সার্ভিসগুলোর কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রদেশভিত্তিক কিছু কোটা চালু করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তত্কালীন সংস্থাপন সচিবের স্বাক্ষরকৃত এক নির্বাহী আদেশে কোটা পদ্ধতি বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৯-এর ১ ধারায় স্পষ্ট করে লেখা আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’ একই অনুচ্ছেদের ২ ধারায় বলা আছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা পদলাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।’ কিন্তু দেখা যাচ্ছে, কোটা পদ্ধতির কারণে নাগরিকের সাংবিধানিক এই অধিকার যথাযথভাবে সংরক্ষিত ও প্রতিপালিত হচ্ছে না। সংবিধানে সমতা ও বৈষম্য দূরীকরণের কথা থাকলেও কোটার নামে বৈষম্য চলমান রাখা হয়েছে, যা মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে।
সরকারি চাকরি লাভের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটা সবচেয়ে বেশি বৈষম্য ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। আমাদের দেশের সূর্যসন্তানরা দেশ স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। অবশ্যই তারা পরিবারের সদস্যদের চাকরির আশায় মুক্তিযুদ্ধ করেননি। তবে কেন মুক্তিযোদ্ধা নামে এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোটা চালু করা হয়েছে? যেসব পরিবারের লোকজন সে সময় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, তারা কি শাস্তিস্বরূপ কোটা নামক মরণ ফাঁদে পড়লেন না? বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী দীর্ঘ সময় শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা কোটা পদ্ধতির সুযোগ পেলেও জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন-শুধু মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা নয়, তাদের নাতি-নাতনিরাও কোটা পদ্ধতির আওতায় পড়বে। প্রধানমন্ত্রীর সে ঘোষণানুযায়ী মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরাধিকারীরা চাকরির ক্ষেত্রে সুযোগ পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা রাষ্ট্রের আইন। একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে তার সিদ্ধান্তের প্রতি আমার শ্রদ্ধা জানানো এবং তা মেনে নেওয়া আবশ্যক। কিন্তু প্রশ্ন হল, দেশের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কত? সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যেভাবে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বাড়ছে তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চল্লিশোর্ধ্বদের সকলে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেলেও কোনো কিছু বলার সুযোগ থাকবে না। অন্যদিকে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নানা প্রতিবন্ধকতায় এখনও স্বীকৃতি পাননি। বরং তাদের নামের কোটাগুলো নকল মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে বণ্টন হয়ে গেছে। বর্তমান সময়ে যেসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার জন্ম হয়েছে তারা রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির চেয়ে দেশের শিক্ষিত সমাজের বেশি ক্ষতি করছে। তাদের অনৈতিকতার চরম খেসারত যোগ্য চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষার্থীদের দিতে হচ্ছে। এসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার কারণে তাদের উত্তরসূরিরা চাকরির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সুযোগ গ্রহণ করছে এবং অন্যদের প্রতারিত করছে। কাজেই সঠিক মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাবদ্ধ করে যোগ্য প্রজন্মের ওপর অবিচার বন্ধ করা আবশ্যক বলে আমি মনে করি এবং এটা সবার সমসাময়িক দাবিও বটে। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটধারীদের কোটার এক দাম্ভিকতা এ সমাজের মেধাবি যোগ্যদের বিষিয়ে তুলেছে।
দেশের অধিকাংশ মানুষ কোটা পদ্ধতি সংস্কারের পক্ষে। সবার মুখে একই কথা, কোটা পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবার দিন এসেছে। বর্ধিত জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে কোটা পদ্ধতির পরিবর্তন, পরিমার্জন এখন বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার কেউ কেউ কোটা পদ্ধতি একদম  বিলোপ করে দেওয়ার কথাও বলছে। তবে সত্যিই আপাতত কোটা পদ্ধতির সংস্কার আবশ্যক। কারণ হিসেবে বলব, সরকার এবং জাতির ভবিষ্যত্ নির্ধারক শ্রেণি যদি জাতির নেতৃত্ব থেকে যোগ্যদের দূরে রাখতে না চান তবে জাতীয় স্বার্থে কোটা পদ্ধতির সংস্কার আবশ্যক।
কোটা পদ্ধতির কারণে মেধাবীরা আজ হতাশ। তবে মেধাবীদের সুযোগ দানে সবচেয়ে বড় অন্তরায় কোটা পদ্ধতির সংস্কারকরত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য অনধিক ১০ শতাংশ কোটার সুযোগ রেখে সর্বমোট ২০ শতাংশ কোটার ব্যবস্থা রাখা হোক। ৫৫ শতাংশের মধ্য থেকে বাকি ৪৫ শতাংশ আনুপাতিক হারে বিলুপ্ত করা হোক। অর্থাত্ সাধারণ প্রার্থীদের জন্য ৮০ শতাংশ বহাল রাখা হোক। বাকি ২০ শতাংশ বিভিন্ন কোটায় বণ্টন করা হোক। সরকার দেশের মেধাবীদের মেধার মান ধরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করুক-সেটাই সবার কাম্য।
লেখক : শিক্ষার্থী