মঙ্গলবার ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮, দুপুর ১২:১৬

ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করবে সরকার

Published : 2017-03-05 15:34:00
রবিউল ইসলাম: সারাদেশে যত্রতত্র ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণে এবার আইন হচ্ছে। আইনের অধীনে সবধরনের নলকূপ স্থাপনে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান নলকূপেরও লাইসেন্স নিতে হবে। আইনের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির বিষয়ে খুব দ্রুত সমীক্ষা করা প্রয়োজন। সেই সমীক্ষার আলোকে পানির প্রাপ্যতা অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে পানি উত্তোলনের অনুমোদন দিতে হবে। তা না হলে আগামী দিনে ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে ভয়াবহ সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন এ সংক্রান্ত পানি বিশেষজ্ঞরা।
কৃষি কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১৭ নামে একটি আইনের খসড়ায় সম্প্রতি অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আইনের খসড়া অনুযায়ী উপজেলা পরিষদের লাইসেন্স ছাড়া কোনো নলকূপ স্থাপন করা যাবে না। আবেদনের ভিত্তিতে উপজেলা কমিটি অনুসন্ধান করে নলকূপ বসানের লাইসেন্স দেবে। সে ক্ষেত্রে উপজেলা কমিটি যেখানে নলকূল স্থাপন করা হবে সেখানকার ভূগর্ভে সঞ্চিত পানির অবস্থা এবং নিকটবর্তী নলকূপের দূরত্বসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে অনুসন্ধান করবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান এ বিষয়ে জানান, ‘আইনটি বাস্তবায়নে কাজ করবে কৃষি মন্ত্রণালয়। তবে এক্ষেত্রে সহায়তা দেবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। মূলত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণে এই আইন করা হচ্ছে।
পানি বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৯৮০ সালের পর থেকে সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়তে থাকে। আর মানুষের বসবাস বেড়ে যাওয়া এবং শিল্প-কারখানায় পানির ব্যবহার বৃদ্ধিতে রাজধানী ঢাকাসহ প্রায় সব বিভাগীয় শহরে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। সারাদেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এত নিচে নেমে গেছে যে, যা আমাদের জন্য খুবই উদ্বেগের। এভাবে চললে দেশের অনেক জায়গায় এক সময় ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যাবে না। এখনই অনেক জায়গায় শুষ্ক মৌসুমে সাধারণ টিউবওয়েল দিয়ে পানি উত্তোলন করা যায় না। কয়েক বছর ধরে বৃষ্টিপাত বাড়লেও শুষ্ক মৌসুমে যে পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হয়, সে পরিমাণ পানি বর্ষাকালে পুনঃভরণ হয় না। পুনঃভরণ হল বৃষ্টি ও নদীর পানি মাটির নিচে গিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্গে যোগ হওয়া। এছাড়া উজানের দেশ ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে শুষ্ক মৌসুমে দেশের অধিকাংশ নদ-নদীতে পানির পরিমাণ একেবারেই কমে যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে ১৯৮৬ সালে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। কিন্তু ১৯৯২ সালে একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেই অধ্যাদেশ স্থগিত করে দেওয়া হয়, যা ছিল অবৈধ। বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনায় তখন এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এরপর থেকে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ে আর কোনো আইন হয়নি। এখন সেই অধ্যাদেশটিকেই নতুন করে সংযোজন-বিয়োজন-পরিশোধন করে আইনে রূপান্তরিত করা হচ্ছে।
১৯৮৬ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী একটি গভীর নলকূপ থেকে আরেকটি গভীর নলকূপ স্থাপন করা যেত ২৫০০ ফুট দূরত্বে। কিন্তু সরকারের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) এক ভুয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সেই দূরত্ব কমিয়ে ১২০০ ফুট করা হয়। গভীর নলকূপ নিয়ে কোনো কাজ না করলেও সরকারি ওই পরামর্শক সংস্থাটি গভীর নলকূপ বসানোর দূরত্ব কমিয়ে আনার বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়। উত্তরাঞ্চলের একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের ইচ্ছাতেই এটি করা হয়। নিয়ম না মানায় বরেন্দ্রসহ উত্তরাঞ্চলের অনেক জায়গায় ভূগর্ভস্থ পানি একেবারে নিচে চলে গেছে। অনেক জায়গায় অগভীর নলকূপ দিয়ে পানি উঠছেই না।
ভূগর্ভস্থ পানি বিশেষজ্ঞ বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক ড. ইফতেখারুল আলম এ বিষয়ে সকালের খবরকে জানান, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে আইন হচ্ছে এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণে এটা করতেই হবে। ভূগর্ভস্থ পানির সমীক্ষাও করতে হবে, সেই সমীক্ষা অনুযায়ী যেখানে পানি যেমন আছে, সেই পরিমাণে তুলতে হবে। ঢাকা শহরের পানি সাগরের গড় উচ্চতা থেকে ২৮০ ফুট নিচে এবং মাটির ওপর থেকে ৩২০ ফুট নিচে পানি। ঢাকার পানি যেভাবে উত্তোলন করা হচ্ছে তা আগামী দিনে ঢাকার জন্য ভালো হবে না। তবে এর সমাধান নিয়ে কাজ হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ড. ইফতেখারুল আলম জানান, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে সেচ কাজের জন্য পানি উত্তোলন করা হয়। চাষের জন্য পানি উত্তোলন করতে হবে। তবে সেচ দক্ষতা বাড়াতে হবে। শস্যের মধ্যেও পরিবর্তন আনতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে এক কেজি ধান উত্পাদনে এখন ২০০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু এক কেজি গম উত্পাদনে ৮০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। আলুর ক্ষেত্রে আরও কম লাগে। এই ভূগর্ভস্থ পানি বিশেষজ্ঞ আরও জানান, আউশ ধানের চাষ বাড়ালে ভালো হয়। কারণ বৈশাখ-জ্যেষ্ঠ মাসে এই ধান রোপণ করা হয়। আউশ ধান লাগানোর সময় একটা বা দুটো সেচ দিলেই আর পানি দিতে হয় না। কারণ এরপর বৃষ্টির পানি শুরু হয়। এতে খরচও কম। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহারও কম হবে। বরিশাল বিভাগে প্রায় ৫ লাখ হেক্টর জমি অনাবাদি থাকে, যেখানে এই আউশ ধান চাষ করা যায়। এছাড়া সারাদেশেই আউশ ধানের ব্যবহার বাড়ানো যায়।
জলবায়ু ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত এই প্রতিবেদককে জানান, টঙ্গী এলাকায় দেখা গেছে একটি শিল্প-কারখানায় পানি উত্তোলন করার সময় পাশের কারখানার নলকূপটিতে পানি উঠছে না। এর কারণ হল নলকূপগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব কম। যেকোনো ধরনের নলকূপের দূরত্ব বিবেচনা করে লাইসেন্স দিতে হবে। এজন্য নতুন আইন খুবই প্রয়োজন।
কৃষিকাজের ব্যবহারের ৭৫ ভাগ পানি মাটির নিচ থেকে উত্তোলন করা হয় উল্লেখ করে আইনুন নিশাত জানান, মাটির নিচের পানির মালিক সরকার। আর দেশের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই সরকারকে ভূগর্ভস্থ পানির বিষয়ে সমীক্ষা করতে হবে। দেশের কোথা থেকে কী পরিমাণ পানি উত্তোলন করা যাবে তা সরকারকে ঠিক করতে হবে। শুধু আইন করলেই হবে না তার প্রশাসনিক তদারকিও জোরালো করতে হবে, যাতে করে প্রভাবশালী মহল বেশি সুবিধা না পায়। কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হয় সেটিও খেয়াল রাখতে হবে। -