বুধবার ২৩ আগস্ট, ২০১৭, রাত ০২:৪২

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে

Published : 2017-08-08 22:36:00, Count : 1473
ড. শেখ আবদুস সালাম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের এক অনন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; সাংবাদিক ও কলাম লেখক কাজী সিরাজের ভাষায় আমাদের ‘গর্বের ধন’। শুধু উচ্চশিক্ষা বিস্তারের জন্য নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সকল আন্দোলন-সংগ্রামে সবসময় পথ দেখানো এবং প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করা এক জেগে থাকা প্রতিষ্ঠান। একটি রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে পৃথিবীর আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এ রকম প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে কি না, তা আমাদের জানা নেই। সম্ভবত এমনটি আর দ্বিতীয় নেই। বাংলাদেশের জন্মযন্ত্রণা অতঃপর এই দেশের গণতন্ত্র এবং সমাজ উন্নয়নের চাকাকে এগিয়ে নেওয়ার ভার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এত বেশি বহন করেছে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছুতেই যেন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। আর সে কারণে বাংলাদেশ ভালো থাকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেন একটু বেশি ভালো থাকে। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব নিয়ে থাকা-না থাকার সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো থাকা-না থাকার ব্যাপারটিও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
সম্প্রতি কিছু কিছু পত্রপত্রিকা ও অন্যান্য গণমাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে বেশ কিছু খবর, প্রবন্ধ সম্পাদকীয় পড়ে কয়েকদিন ধরে আমাদের সকলের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পরিচিতজনরা যোগাযোগ করে জানতে চাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ কী হাল? যতটুকু বুঝতে পারি মানুষের মনে এই প্রশ্ন ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে মূলত দুটো ইস্যুকে নিয়ে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু খবরাখবরকে ঘিরে।
প্রথম ইস্যু হচ্ছে সম্প্রতি (২৯. ৭. ২০১৭ তারিখ) অনুষ্ঠিত সিনেট অধিবেশন উপলক্ষে সিনেট বডির কার্যকারিতা, বর্তমান উপাচার্য কর্তৃক সিনেট ডাকা এবং সিনেট সভায় উপাচার্য প্যানেল গঠন নিয়ে। পাঠকদের জন্য জানিয়ে রাখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট হচ্ছে একটি চলমান বডি। সিনেটের পূর্ণতা আসে যখন শিক্ষক, রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট, অধিভুক্ত কলেজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকার, পার্লামেন্ট, ডাকসু বিভিন্ন ১৩ ধরনের সেকশনের প্রতিনিধি নিয়ে উপাচার্য, প্রো-উপাচার্যদ্বয় ও ট্রেজারারসহ ১০৫ জন সদস্যের সদস্যপদ কার্যকর থাকে। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডার প্রণীত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত মাত্র একবার (১৯৭৪ সালে) সিনেট পূর্ণ হয়েছে। ওই সময় সিনেটে তখন সদস্য সংখ্যা ছিল ১০২। ১৯৭৪ সালে এই সিনেট সভা বসেছিল ৮২ জন সদস্য নিয়ে।
বর্তমানে সিনেটের মোট সদস্যসংখ্যা হচ্ছে ১০৫। কিন্তু বিভিন্ন সেকশনের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় কার্যকর সদস্যসংখ্যা রয়েছে ৫৫। গত ২৯ জুলাই এই সিনেট বসেছিল ৪৭ জন (৮৫ শতাংশ) সদস্য নিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট, ডাকসু বা আরও কোনো সেকশনের প্রতিনিধিত্ব বা সদস্য না থাকলে সিনেট চলমান থাকে কী? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডারের ৫৫ আর্টিকলে বলা রয়েছে-‘No act or proceedings of any authority or other body of the University shall invalied or be called in question merely on the ground of the existence of any vacancy in such Authority or body, or of the failure or defect in making or holding any appointment, nomination or election to, or of any such defect in the formation of, such Authority or body’. উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ জুলাইয়ের সিনেট সভায় পরবর্তী ৪ বছরের জন্য উপাচার্য নিয়োগদানের লক্ষ্যে ৩ সদস্যের একটি উপাচার্য প্যানেল গঠন করা হয়েছিল।
এই সভা আহ্বান করা নিয়ে পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে যে, উপাচার্য ৩০ জন সিনেট সদস্যের লিখিত অনুরোধপত্র ছাড়া বিশেষ সিনেট সভা ডাকতে পারেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডার : ১৯৭৩-এর ২১(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘The Vice-Chancellor may whenever he thinks fit, and shall, upon a requisition in writing signed by not less than thirty members of Senate, convene a special meeting of the Senate’. এই অর্ডারের আলোকে প্রণীত রেগুলেশন ১২-তে বলা রয়েছে ‘Quorum of Senate will be formed by the presence of twenty-five members’. উল্লেখ্য, ২৯ জুলাইয়ের সিনেট সভায় ৪৭ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
দুয়েকটি পত্রপত্রিকা, টিভি চ্যানেল এই সিনেটের চলমানতা, কার্যকারিতা ও উপাচার্য কর্তৃক ডাকা এই সিনেটকে অবৈধ বলে খবরাখবর, আলোচনা-সমালোচনা ইত্যাদি লিখেছে, ব্যক্তিবিশেষের সাক্ষাত্কার প্রচার করেছে। ফলে দেশবাসীর মনে প্রশ্ন জেগেছে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাহলে কি সর্বত্র আইন ভেঙে পরিচালিত হচ্ছে? আশা করি উপরের তথ্য থেকে পাঠক তার জবাব খুঁজে নিতে পারবেন। এই সুযোগে একটি প্রশ্ন রাখি যে ২০১৭ সালের (সম্ভবত ২৬ জুন) বাজেট সংক্রান্ত সিনেট সভা এবং তার আগে-পরে কিংবা ২০০৮ থেকে এ পর্যন্ত যতবার সিনেট সভা বসেছে সেগুলো কি পূর্ণ সিনেট ছিল? তা না থেকে থাকলে আজ যারা পূর্ণ সিনেট না থাকায় সিনেট অধিবেশনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা অনেকেই তখন ওইসব সভায় সিনেট সদস্য হিসেবে যোগদান করেছিলেন, ভেলিবারেশনে অংশ নিয়েছিলেন। অপূর্ণ সিনেট তখন বৈধ ছিল, আর এখন সেটি অবৈধ-ব্যাপারটি কেমন হল?
মানুষের মনে দ্বিতীয় যে প্রশ্নটির উদ্ভব হয়েছে এবং উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছে সেটা হল পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে যে গত সাড়ে ৮ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯০৭ জন অর্থাত্ এত বেশি সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে। বলে রাখা ভালো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার থেকে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক, সহযোগী থেকে অধ্যাপক হওয়া সবকিছুই কিন্তু একেকটি নতুন নিয়োগ, প্রকৃতপক্ষে প্রমোশন নয়। প্রত্যেকটা স্তরের জন্য শিক্ষকগণ নতুনভাবে দরখাস্ত করে পরের ধাপে নিয়োগ পান। আমার ধারণা, গণমাধ্যম ৯০৭ জন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে বলে যে খবর লিখেছে প্রকৃতপক্ষে খোঁজ নেওয়া উচিত প্রভাষক লেভেলে নতুন এন্ট্রি/নিয়োগ ঘটেছে কতজনের? বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত প্রকৃত সংখ্যা গণমাধ্যমকে জানিয়ে দেওয়া।
আরেকটি বিষয় ভেবে নেওয়া দরকার গত সাড়ে ৮ বছরে যুুগের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ৪টি নতুন অনুষদ (বর্তমানে মোট ১২টি অনুষদ) এবং ১৬টি নতুন বিভাগ (বর্তমানে মোট ৮৩টি বিভাগ) খোলা হয়েছে। এসব জায়গা থেকে অবসরে চলে গেছেন। আবার নতুন বিভাগ চালানোর জন্য নতুন করে অনেক নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হয়েছে। নতুন এবং পুরাতন সকল ইনস্টিটিউট এবং বিভাগের জন্য সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন অনুমোদিত একটি শিক্ষক জনবল কাঠামো রয়েছে। এত বিশাল সংখ্যক নিয়োগ নিয়ে প্রথম বিবেচ্য হওয়া উচিত যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন অনুমোদিত জনবল কাঠামোর বাইরে বেশি সংখ্যায় শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে? গত ৩০-৩২ বছরের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতায় এ ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত উত্তর হচ্ছে ‘না’। যা হোক, ঢাবি কর্তৃপক্ষের এই বিষয়টিও পরিষ্কার করা উচিত।
এখন প্রশ্ন আসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যখন বিভিন্ন ইনস্টিটিউট বা বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে সেক্ষেত্রে কি ইনস্টিটিউটের গভর্নিং বোর্ড কিংবা বিভাগীয় সিঅ্যান্ডডি-র শিক্ষক প্রয়োজনীয়তা (সংখ্যা) এবং তাদের প্রয়োজনমতো বেঁধে দেওয়া (এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যথাযথভাবে অনুমোদিত) যোগ্যতা/অভিজ্ঞতা মেনে নিয়োগ বোর্ডগুলো এসব শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করেছে? সিন্ডিকেটও কি বিজ্ঞাপন এবং নিয়োগ বোর্ডের সুপারিশমাফিক তা অনুমোদন করেছে? পত্রপত্রিকা, টিভি চ্যানেলে দু’চারজন নেতৃস্থানীয় শিক্ষক এ ব্যাপারে এখন সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। আমি তাদের সোচ্চার হওয়া কিংবা প্রতিবাদকে সম্মান করি। কিন্তু আমার জানা মতে, গত সাড়ে ৮ বছরে এদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কোনো বডি নেই, যেখানে তারা ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে-বাইরে সর্বত্র তারা পদ-পদবি নিয়েই ছিলেন। সাড়ে ৮ বছর ধরে শিক্ষক নিয়োগ, সিনেট-সিন্ডিকেট সভা আহ্বান প্রভৃতি যা কিছু ঘটেছে তার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে এসব শিক্ষক সবাই না হলেও অনেকেই জড়িত ছিলেন। আমরা আশা করব, তারা তাদের হাতে সৃষ্ট ডেভিয়েশনগুলো (যদি হয়ে থাকে) সততার সঙ্গে প্রকাশ করবেন। এসব শিক্ষক নিয়োগের কমিটিগুলোতে কারা সদস্য ছিলেন, সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে কে কী ভূমিকা পালন করেছেন, তার একটি শ্বেতপত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগেই জাতির সামনে প্রকাশ করতে পারে। গতকাল এক অবস্থান, আজ এক অবস্থান, রাত পোহালে আরেক অবস্থান। অবস্থান বদল করে এমনভাবে কথা বললে সাধারণ মানুষের কাছে তা বড়ই বেমানান মনে হয়।
গণমাধ্যমে খবরে যা লেখা হচ্ছে তা সবই মিথ্যা-সে কথা হয়তো হলফ করে বলা যাবে না। যেমন বিজ্ঞাপনে একরকম সিজিপিএ চাইলাম এবং মিনিমাম সেই রিকুইজিট কোয়ালিফিকেশন থেকে সরে এসে তা পূরণ করে না এমন প্রার্থী নিয়োগ দিলাম, এটা আইনের ব্যত্যয়। এ কারণে সম্প্রতি উচ্চ আদালতের দেওয়া রায়কে আমি যথার্থ মনে করি।
এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দরখাস্ত করার মান পুনর্নির্ধারণ করে পুনঃবিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রয়োজনমাফিক যথাযথ যোগ্য প্রার্থীকে চাকরি দিয়ে অন্তত আইনের ব্যত্যয় না ঘটিয়ে একই কাজটি করতে পারত। তবে এ ধরনের উদাহরণ খুব বেশি রয়েছে বলে আমার মনে হয় না। এরপরেও এই সংখ্যা যদি এক/দুটিও হয়ে থাকে সেটিও খারাপ উদাহরণ। কিন্তু গণমাধ্যম এমনভাবে লিখছে যেন গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এ ধরনেরই যজ্ঞ চলছে আর এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হয়ে যাচ্ছে, রসাতলে যেতে বসেছে।  
এখন দেখছি পুরনো প্রশাসনের কিছু কর্তাব্যক্তিরাও গণমাধ্যম এবং সদ্য ঋষিজনদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলছেন গত কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয় যেন ডুবতে বসেছে। আমি নিজে ১৯৮৯ সালে ১ বছর ১১ মাস ১৮ দিন সহকারী অধ্যাপক পদে সক্রিয়ভাবে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও সহকারী অধ্যাপক (স্থায়ী) পদে নিয়োগের সময় আমাকে ইন্টারভিউ কার্ড পর্যন্ত ইস্যু করা হয়নি। আমাদের জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার তার বিভাগে সেরা ফল করা সত্ত্বেও তাকে শিক্ষক হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি, কমনওয়েলথ বৃত্তির জন্য সেরা প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও তাকে সেখানে নমিনেশন দেওয়া হয়নি। একজন প্রাক্তন উপাচার্যের নিজ বিভাগ মৃত্তিকা বিজ্ঞানে ২০০৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়ার কী হাল ছিল তা ওই সময়ের বিভাগীয় চেয়ারম্যান, বর্তমানে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে খবর নিলেই জানা যাবে। আজ অনেকেই এমন সুরে কথা বলছেন যে, গত কয়েক বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হয়ে গেছে, আগে যেন সবই ভালো ছিল। সবাই আমরা আয়নায় নিজের চেহারা, নিজের আমলের চেহারার দিকে তাকালে দেখা যাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেমন ছিল আর এখন কেমন চলছে। তবে আমি মনে করি, খারাপ উদাহরণ দিয়ে খারাপ কাজ করা কোনোক্রমেই ঠিক নয়।
পত্রিকার খবরাখবর পড়ে আমি নিজেও সবচেয়ে বিস্মিত হয়েছি যে বর্তমান সময়ে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই ‘অসম্ভব’ বিষয়টির কারণে আমি ওই নিয়োগের ডকুমেন্ট অর্থাত্ সিঅ্যান্ডডি-র মতামত, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগপত্রের কপি ইত্যাদি জোগাড় করেছি। পাঠকের উদ্দেশে আমি বিভাগীয় সিঅ্যান্ডডি কর্তৃক সুপারিশকৃত নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়টি নিচে তুলে দিচ্ছি-২৫/০৭/২০১৬ইং তারিখে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় সিঅ্যান্ডডি কমিটির জরুরি সভার সিদ্ধান্তসমূহ নিম্নরূপ : ‘অত্র বিভাগের নামে Applied Chemistry and Chemical Technology পরিবর্তন করে Applied Chemistry and Chemical Engineering করা হয়েছে এবং সিলেবাস পরিবর্তন করে বিভিন্ন বর্ষে Chemical Engineering নতুন কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাছাড়া বিভাগের প্রদত্ত ডিগ্রির Accreditation পাওয়ার জন্য বিভাগে মোট শিক্ষকের মধ্যে কমপক্ষে ঈযবসরপধষ ঊহমরহববত্রহম ডিগ্রিধারী তিন ভাগের এক ভাগ (৩৩ শতাংশ) হওয়া প্রয়োজন কিন্তু বর্তমানে আছে মাত্র ৬ শতাংশ শিক্ষক।
তাই সিঅ্যান্ডডি কমিটি মনে করে শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চলমান রাখা এবং অপপত্বফরঃধঃরড়হ পাওয়ার জন্য শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে Chemical Engineering ডিগ্রিধারীদেরকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগদানের সুপারিশ করা হোক। এক্ষেত্রে গ.ঝপ ডিগ্রিপ্রার্থী না পাওয়া গেলে শর্তাবলি আরোপ করে বা শর্তাবলি শিথিল করে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করা হোক।’ এই ছিল সিঅ্যান্ডডি-র সুপারিশ এবং বিজ্ঞপ্তির ভাষা। যিনি নিয়োগ পেয়েছেন তার নিয়োগপত্রে নিয়োগের এক নম্বর শর্ত ছিল ‘কাজে যোগদানের তারিখ হইতে আপনার এই নিয়োগ অস্থায়ী ভিত্তিতে কার্যকর হইবে। তবে শর্ত থাকে যে, মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করিবার পর আপনি স্থায়ী পদের জন্য এবং পদোন্নতির জন্য আবেদন করিবার যোগ্যতা অর্জন করিবেন’। শুনেছি এক্ষেত্রে আবেদনকারীদের মধ্যে কারও মাস্টার্স ডিগ্রি ছিল না।
উল্লেখ্য, বুয়েটে শিক্ষকগণ স্নাতক ডিগ্রি নিয়েই সেখানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হন। যা হোক, এই তথ্যগুলো তুলে ধরলাম এ কারণে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে অনুমেয় তথ্য কিংবা অসত্য বা অর্ধসত্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ওই প্রতিষ্ঠানের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়, এমন খবরাখবর ঢালাওভাবে প্রকাশ করা ঠিক নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এই কথাটি আমাদের সকলকে আরও বেশি করে উপলব্ধি করা দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আরোপিত বা অসত্য/অর্ধসত্য তথ্যের কারণে ইমেজ হারিয়ে ফেললে মাতৃসম এই প্রতিষ্ঠানের অ্যালামনাই হিসেবে আমরা সবাই যেমন ছোট হয়ে যাব, তেমনি বাংলাদেশও তার ইমেজ হারানোর সঙ্কটে পড়ে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যারা চালান এই কথাটি সবসময় তাদের মাথায়ও রাখতে হবে। আমরা কেউ কোনোক্রমে যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য আর ইমেজকে নড়বড়ে করে না ফেলি। আমাদের গণমাধ্যমগুলো যেন আরও গভীরে গিয়ে কেবলই সত্য তথ্যের ভিত্তিতে বস্তুনিষ্ঠভাবে খবরাখবর প্রকাশ-প্রচার করে।
লেখক : অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
skasalam@gmail.com