শনিবার ২০ জানুয়ারি, ২০১৮, সন্ধ্যা ০৭:২০

চালের কৃত্রিম সঙ্কট

Published : 2017-08-08 22:36:00
অলোক আচার্য্য: চালের দাম এখনও সন্তোষজনক পর্যায়ে আসেনি। যদিও এদেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির গতি যতটা দ্রুত হয় মূল্য কমার গতি তার থেকে বহুগুণে কম হয়। তবে আশা করা যায় শিগগিরই চালের বাজার সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। কারণ ভিয়েতনাম, ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে চাল আমদানি করা হচ্ছে। এসব দেশ থেকে চাল পৌঁছেও গেছে। আরও আসার প্রক্রিয়া চলছে। সুতরাং আশা করা যায়, শিগগিরই দাম সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। শুরু থেকেই কর্তৃপক্ষ বলে আসছিল এটা কৃত্রিম সঙ্কট। অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা চালের মজুদ করে দাম বাড়াচ্ছে। আমরাও আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম যদি এসব মুনাফালোভীর কাজই হয় তাহলে সরকার এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে। আবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে চালের দাম। অন্তত মোটা চাল, যা সাধারণত নিম্নবিত্ত আয়ের মানুষ ক্রয় করে। সেই দামও ছিল হাতের নাগালের বাইরে। সরকার কালোবাজারিদের চিহ্নিত করতে পেরেছে এবং তাদের কাছ থেকে চাল না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যারা দেশের মানুষের সঙ্গে এ রকম করতে পারে তাদের শাস্তি যথেষ্ট কি না তা কর্তৃপক্ষের বিষয়।
এখনও বাজারে চালের অগ্নিমূল্য। বেশ কয়েক মাস ধরেই বাজারের এই অবস্থা। অস্থির বাজারের সঙ্গে অস্থির জনজীবন। ক্রমবৃদ্ধিপ্রাপ্ত এ চালের বাজারের আগুনের আঁচ লাগছে সাধারণ মানুষের ওপর। বলা যায়, এই তাপে তারা রীতিমতো জ্বলছে। কারণ এ জ্বালা কেবল যারা নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্ত শ্রেণির, তাদেরই বেশি। বিভিন্ন মহল থেকে দাম বাড়ার নানা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। তবে মূল কাজটা এখনও হচ্ছে না। মানে দাম কিন্তু বাড়তির দিকেই এতদিন ছিল। এই সঙ্কট কৃত্রিম তা আমরা জানলাম। অসাধু ব্যবসায়ীরা যে সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে টাকার পাহাড় গড়ে তা আরও একবার প্রমাণ করল। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এই আশাতেই পথ চেয়ে থাকে যে চালের দাম কমবে। হাওর অঞ্চলের ধান ডুবলেও আশ্বস্ত করা হয়েছিল এটা বোরো ধান ওঠার পর ক্ষতি পুষিয়ে যাবে। কিন্তু দাম বেড়েই চলেছে। এমনকি মোটা চালের দামও বেড়েছে। রেকর্ড দামে মোটা চাল বাজারে বিক্রি হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের স্বপ্ন এখন চাল কিনতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। পাঁচজনের একটি পরিবারে যদি একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি থাকে তাহলে চাল কিনতেই প্রতিদিনের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে। গত এক মাসেই মোটা চালের দাম আট শতাংশ বেড়েছিল। চিকন চাল তো কেজিতে ষাট টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। এই দাম কি আরও বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কাও করেছে কেউ কেউ। নিম্ন আয়ের মানুষ নাকি ভাত খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। এ রকম খবরও পত্রিকায় এসেছিল। এটা কতটা দুঃখজনক। কেবল ক্রয় করার সামর্থ্য না থাকায় মাছে-ভাতে বাঙালি থেকে মাছে আটায় বাঙালি হয়ে যাচ্ছি। কী আশ্চর্য!
পেট ভরলেই তো সুষ্ঠু চিন্তা সম্ভব। ক্ষুধার জন্য করে না এমন কাজ আর নেই। তাই ক্ষুধামুক্ত দেশ গঠনের এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দশ টাকা কেজি দরে যখন চাল বিক্রি হলে আমরা সাধারণ মানুষ যখন আনন্দিত হই তখন অন্যদিকে কিছু সুবিধাভোগী মানুষ তা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার ক্ষীণ উদ্দেশ্যে ব্যস্ত থাকে। তাদের মনেও আশা থাকে। তবে তা অন্যদের জন্য নয়, নিজের স্বার্থ হাসিলের। একটি মহত্ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। যখন এই দশ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির ঘোষণা আসে তখন আমরা আনন্দিত হই এই ভেবে যে দেশের প্রতিটি মানুষ তিন বেলা পেট পুরে ভাত খেতে পারবে। কিন্তু চাল বিক্রি শুরু হওয়ার পর থেকেই নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ হতে থাকে এই মহত্ উদ্দেশ্য। প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই দেখতে পাই দেশের বিভিন্ন জায়গায় গরিবের হকের চাল চলে যাচ্ছে বিত্তবানদের দখলে। অনেকে খুলে বসছেন লাভজনক ব্যবসা। গরিবের ক্ষুধা নিয়ে ব্যবসার ফল যে শুভ হয় না তা মনে হয় এসব অর্থলোভী জানে না। অনেক মহত্ উদ্দেশ্যই বাস্তবায়নের অভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। পত্রিকা খুললেই চোখে পড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে গরিবের পেটের আহার চলে যাচ্ছে অসত্ পয়সাওয়ালাদের পেটে। খুব কি দরকার ছিল? এর মধ্যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সব শ্রেণিপেশার মানুষ জড়িত রয়েছে। যার কার্ড পাওয়ার কথা সে পাচ্ছে না। যার সামর্থ্য আছে তারা কার্ড নিয়ে বসে আছে। দুর্নীতির কথা কতক্ষণ আর ঢাকা থাকে। চাল নিয়েই দেশে কত কারসাজি হয়!
যার যত আছে সে তত চায়। চাইতে চাইতে তার মাত্রা মনে হয় এতটা বেড়ে যায় যে হিতাহিত জ্ঞানশুন্য হয়ে চাইতে থাকে। পাওয়ার জন্য চাওয়ার হাতটা বাড়িয়েই থাকে। যেন হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। সে তার অধিকারের হোক বা অন্য কারও। তাতে অবশ্য দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের কিছু যায় আসে না। জ্ঞানশূন্য হয়েই তো সে লঙ্কাকাণ্ড করে ফেলে। কেননা, এসব মানুষ সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে বাড়ি-গাড়ি করার জন্য নয়। নিজের এবং পরিবারের উদরপূর্তির জন্য। কখনও তা পারে আবার কখনও পারে না। সারাদিন পর হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে কেবল দু’মুঠো ভাতের স্বাদ নিতে চায় সাধারণ মানুষ। ওরা ঠিক বোঝে না চালের দাম এত বাড়ছে কেন। ওরা শুধু জানে চাল কিনতেই পকেটের পয়সা ফুরিয়ে যাবার জোগাড় হচ্ছে। প্রথম থেকেই এটি কৃত্রিম সঙ্কট বলে যে দাবি করা হচ্ছিল অসত্ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সে কথার সত্যতার প্রমাণ করে। তাছাড়া চাল আমদানিও হচ্ছে। তাহলে আমরা আশা করতেই পারি দ্রুতই চালের বাজার স্বাভাবিক হবে।