সোমবার ২২ জানুয়ারি, ২০১৮, সন্ধ্যা ০৬:৩৭

মেজর জিয়াউদ্দিন

Published : 2017-07-30 23:31:00
জহিরুল ইসলাম: মুক্তিযুদ্ধ আর সুন্দরবন, এই দুটি শব্দের সঙ্গে মেজর (অব) জিয়াউদ্দিন নামটি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হায়েনাদের পরাস্ত করতে সুন্দরবন অঞ্চলকে বেছে নেন তত্কালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অদম্য সাহসী এই বাঙালি অফিসার। সেই থেকে তিনি আজীবনের জন্য জড়িয়ে পড়েন সুন্দরবনের প্রেমে। মুক্তিযুদ্ধে তিনি ৯নং সেক্টরের সুন্দরবন সাব-সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। সুন্দরবন আর এ অঞ্চলের জেলেদের জন্য আজীবন লড়াই করে গেছেন অকুতোভয় এই সৈনিক। এজন্য জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত জলদস্যু ও বনদস্যুদের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান করতে হয় তাকে। তাদের হামলায় কয়েকবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন জিয়াউদ্দিন।
জিয়াউদ্দিনের পূর্বপুরুষের বাড়ি পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়ায়। আইনজীবী আফতাব উদ্দিন আহমেদের ছেলে জিয়াউদ্দিন ১৯৫০ সালে পিরোজপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ২০ মার্চ সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ছুটিতে বাড়ি আসেন। এ সময় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ৯নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এমএ জলিলের নির্দেশে জিয়াউদ্দিন সুন্দরবন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলার কাজে হাত দেন। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে মুক্তিবাহিনীর একটি দল নিয়ে তিনি রায়েন্দা বাজারে যান এবং থানা থেকে রাইফেল ও গোলাবারুদ এনে তা সবার মাঝে ভাগ করে দেন। এরপর শরণখোলা-সুন্দরবন অঞ্চলে বিশাল মুক্তিবাহিনীর দল ও ঘাঁটি গড়ে তোলেন তিনি। তার নেতৃত্বে ওই এলাকায় ছোট-বড় ৫২টি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এসব ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা তার নির্দেশনায় একেকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে বিভিন্ন জায়গায় অপারেশনে যেতেন। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা যুবকদের তিনি ভারতে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠাতেন।
১৯৭১ সালের ১৮ আগস্ট তার পরিকল্পনায় সুন্দরবন এলাকার শেলা নদীতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বহনকারী একটি স্টিমার আক্রমণ করা হলে স্টিমারটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সময় স্টিমারে থাকা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা হতাহত হয়। ১ অক্টোবর সুন্দরবন মুক্তিবাহিনীর সাব-সেক্টর হেড কোয়ার্টারসহ সমস্ত আস্তানায় পাকিস্তানি যৌথ বাহিনী ও রাজাকাররা সপ্তাহব্যাপী সাঁড়াশি আক্রমণ চালালে জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে সুন্দরবনের মুক্তিবাহিনী তাদেরকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়।
ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা বাজারে রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। তার নেতৃত্বে ৭ ডিসেম্বর শরণখোলা হানাদারমুক্ত হয়। এরপর সেখান থেকে দুই শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে মোরেলগঞ্জ বাজার আক্রমণ করেন তিনি। এ সময় কুঠিবাড়িতে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের মুখে তখন পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জিয়াউদ্দিন প্রথমে ক্যাপ্টেন ও পরে মেজর পদে পদোন্নতি পান।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলির সময় জিয়াউদ্দিন ডিজিএফআইয়ে কর্মরত ছিলেন। তখন মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের পুলিশে ভর্তির জন্য তিনি পিরোজপুরে অবস্থান করছিলেন অভ্যুত্থান-পাল্টাঅভ্যুত্থানে জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় চলে এলে তার অধীনে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান জিয়াউদ্দিন। এ সময় তিনি আবার ফিরে যান তার সুন্দরবনের ঘাঁটিতে। তত্কালীন সরকার তাকে ধরার জন্য অর্থ পুরস্কার ঘোষণা করে। কিন্তু তাকে কোনোভাবেই গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছিল না। ওই অঞ্চলের জেলেরা তাকে আশ্রয় দিয়ে রাখছিলেন। অবশেষে ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে মঠবাড়িয়ার মাঝেরচরে এক জেলেনৌকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ ও নৌবাহিনীর এক বিশাল বাহিনী গোটা দুবলার চর ঘেরাও করে অনেক খুঁজেপেতে তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। পুলিশের গোয়েন্দারা তার দীর্ঘ অবয়ব দেখে তাকে শনাক্ত করে। গ্রেফতার করে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় থানায় নেওয়া হয়। এ সময় হাজারো মানুষ থানা ঘেরাও করে রাখে। তারা শুনেছিল জিয়াউদ্দিনকে হত্যা করা হয়েছে। উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার জন্য তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে থানার ভেতরে নিয়ে জিয়াউদ্দিনকে দেখানোর পর তারা থানা থেকে ফিরে যায়। এরপর কর্নেল তাহের, মেজর জিয়াউদ্দিন এবং জাসদ নেতৃবৃন্দের বিচার হয়। গোপন বিচারে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি এবং মেজর জিয়াউদ্দিনকে যাবজ্জীবনসহ অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
১৯৮০ সালে জিয়াউদ্দিন সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পান এবং জাসদে যোগ দেন। ৮৩ সালে জেনারেল এরশাদের সময় প্রথমে তিনি দেশ ছেড়ে সিঙ্গাপুরে আশ্রয় নেন। ১৯৮৪ সালের অক্টোবরে ছোট ভাই কামালউদ্দিন আহমেদ, ভাগ্নে শাহানুর রহমান শামীম ও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে চলে যান সুন্দরবনের দুবলার চরে। বনদস্যু বাহিনীগুলোর হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত সুন্দরবনের জেলেদের সংগঠিত করে শুরু করেন শুঁটকি মাছের ব্যবসা। তিনি জেলেদের আর্থিক নিরাপত্তা, জলদস্যু দমন, দুর্যোগ মোকাবেলায় সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণসহ বিভিন্ন সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।
মেজর (অব) জিয়াউদ্দিন ১৯৮৯ সালে পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর গড়ে তোলেন ‘সুন্দরবন বাঁচাও’ কর্মসূচি নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। কখনও জেলেদের নিয়ে, কখনও প্রশাসনকে সহায়তা দিয়ে ডাকাতদের নির্মূলে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন তিনি। এ কারণে সুন্দরবনের একাধিক ডাকাত গ্রুপ বিভিন্ন সময়ে তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এসব ডাকাত গ্রুপ জিয়াউদ্দিনকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। তিনি একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ মোর্তজা বাহিনীর সদস্যরা পূর্ব সুন্দরবনের চরপুঁটিয়ায় জিয়াউদ্দিনকে লক্ষ করে গুলি চালায়। বন্দুকযুদ্ধে মোর্তজা বাহিনীর চার সদস্য নিহত ও মেজর জিয়া মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জিয়াউদ্দিনের রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবনের সেই উন্মাতাল দিনগুলো  ও সুন্দরবন সমরে ও সুসময় নামে দুটি গ্রন্থ।
গত ২৮ জুলাই ভোরে আজীবন যোদ্ধা মেজর (অব) জিয়াউদ্দিন আহমেদ সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
লেখক : সাংবাদিক