সোমবার ২২ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ১০:৩১

স্মার্ট কার্ড নিয়ে বিপাকে নির্বাচন কমিশন

Published : 2017-07-30 23:28:00, Updated : 2017-07-31 09:33:03
গোলাম সামদানী: বন্ধ হয়ে গেছে বহুল প্রত্যাশিত স্মার্ট কার্ড ছাপানোর কাজ। দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের অবার্থুর টেকনোলজিস (ওটি) সময়মতো স্মার্ট কার্ড সরবরাহ না করায় গত ২৩ জুলাই থেকে কার্ড ছাপানোর কাজ বন্ধ করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কবে আবার স্মার্ট কার্ড ছাপানো এবং বিতরণ শুরু হবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। ফলে মুখ থুবড়ে পড়ছে বহুল প্রত্যাশিত স্মার্ট কার্ড প্রকল্প। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
অন্যদিকে ফ্রান্সের অবার্থুর টেকনোলজিস (ওটি) কোম্পানির স্মার্ট কার্ড সরবরাহে সময়ক্ষেপণ এবং চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করায় চরম ক্ষুব্ধ ইসি। ফলে স্মার্ট কার্ড প্রকল্প নিয়ে বিকল্প চিন্তাভাবনা করছে ইসি। আর এক্ষেত্রে ফ্রান্সের আইটি কোম্পানি ওটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হলে গাজীপুর মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির মাধ্যমে স্মার্ট কার্ড উত্পাদন করা যায় কি না তা নিয়েও আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের আওতায় কেনা ১০টি মেশিনেই এসব কার্ড প্রক্রিয়াকরণ নিয়ে কাজ করছে ইসি। শুধু তাই নয়, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি দু’বার স্মার্ট কার্ডের নমুনা তৈরি করে ইসিকে দেখিয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি ইসি।
ইসি সূত্র জানায়, স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি ও
বিতরণের লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি ইসির সঙ্গে ফ্রান্সের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অবার্থুর ৮১৬ কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে দেশের ৯ কোটি ভোটারের জন্য স্মার্ট কার্ড তৈরি ও বিতরণের কথা ছিল। কিন্তু এ সময় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রার ১৪ শতাংশের চেয়ে কম কার্ড ছাপানো হয়েছে। আর বিতরণ করা হয়েছে তিন শতাংশেরও কম। এরপর ওই চুক্তির মেয়াদ ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। চুক্তির আড়াই বছরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ২৫ লাখ ৭০ হাজার নাগরিকের হাতে স্মার্ট কার্ড পৌঁছাতে পেরেছে, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২ দশমিক ৮৬ শতাংশ। আর চুক্তির বর্ধিত মেয়াদ পর্যন্ত প্রস্তুত হয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ ১০ হাজার কার্ড, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এ অবস্থায় ৮৬ শতাংশ কার্ড ছাপানো বাকি থাকতেই গত সপ্তাহ থেকে স্মার্ট কার্ড ছাপানো বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে কার্ড ছাপানো না হলেও ফ্রান্স থেকে এ পর্যন্ত ব্ল্যাঙ্ক কার্ড এসেছে ৬ কোটি ৬৩ লাখ ৬০ হাজার, যা লক্ষ্যমাত্রার ৭৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। আরও ২৯ লাখ ৫০ হাজার কার্ড পাইপলাইনে রয়েছে।
ইসি সূত্র জানায়, গত ৩ জুলাই ইসি সচিবকে দেওয়া এক চিঠিতে আইডিইএ প্রকল্পের পরিচালক স্মার্ট কার্ডের অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরেন।
এতে উল্লেখ করা হয়, থানা ও উপজেলা পর্যায়ে ১ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার কার্ড পৌঁছানো হলেও বিতরণ করা হয়নি। আর নাগরিকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ২.৫৭ মিলিয়ন।  
এ বিষয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত কমিটির প্রধান ও নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত্ হোসেন চৌধুরী গতকাল সকালের খবরকে বলেন, ‘স্মার্ট কার্ড উত্পাদন আপাতত বন্ধ রয়েছে। যতক্ষণ না ওটি কোম্পানির সঙ্গে নতুন কোনো সিদ্ধান্তে আসা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ছাপানোর কাজ বন্ধই থাকবে এবং এটা আমরাই করেছি।’  
তিনি বলেন, গত জুন মাসে ফ্রান্সের কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তারপরও তারা ইসির সার্ভারে প্রবেশ করতে চায়-আমরা তো তা দিতে পারি না। এখানে আমাদের জাতীয় স্বার্থ রয়েছে। তাদের সঙ্গে চুক্তি থাকবে কি থাকবে না, এটা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্পাদন বন্ধই রাখতে হবে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত্ হোসেন চৌধুরী বলেন, আমরা একবার প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ওটির সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করা হবে না। কিন্তু পরে তারা ওয়াদা করেছিল ডিসেম্বরের মধ্যে সব স্মার্টকার্ড সরবরাহ করবে। পরে আমরা অষ্টম প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটিতে সিদ্ধান্ত নেই শর্ত সাপেক্ষে ওটির সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করা হতে পারে। আমরা আন্তর্জাতিকভাবে আইনজীবী নিয়োগ করি। পরে দুই পক্ষের আইনজীবীরা বসে কিছু সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তী সময় তাদের আইনজীবীরা যে সারসংক্ষেপ পাঠান তাতে দেখা গেছে, ওটি নতুন করে এমন কিছু শর্ত পাঠিয়েছে, যা আমাদের জাতীয় স্বার্থকে বিঘ্নিত করার মতো। অর্থাত্ সব দায়ভার আমাদের নিতে হবে। এই সব শর্ত আমরা মেনে নিতে পারি না। ইসি মনে করছে, ওটির সঙ্গে আবার চুক্তিবদ্ধ হলেও তারা নতুন নতুন শর্ত আরোপ করবে। এসব দিক বিবেচনা করে স্মার্ট কার্ড ছাপানো বন্ধ রয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে এই মুহূর্তে তা বলাও মুশকিল।
 দেশীয়ভাবে উত্পাদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই বিষয়ে এখনও কোনো আলোচনা কিংবা সিদ্ধান্ত হয়নি।
এর আগে জাতীয় পরিচয়পত্র অনু বিভাগের (এনআইডি) মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সময়মতো তারা সব কার্ড কেন দেয়নি, তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। তার আলোকে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ফান্সের ওই কোম্পানি ২৮ মাসে মাত্র ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ কাজ করেছে। ২৮ মাসে এ কোম্পানি কী কাজ করেছে, তার কৈফিয়ত চেয়েছি। তাদের বলেছি, এ জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে মোট ভোটারের সংখ্যা ১০ কোটি ১৮ লাখ। ৯ কোটির জন্য স্মার্টকার্ডের চুক্তি হলেও এখন এই ৯ কোটি ভোটারের সবাই স্মার্ট কার্ড পাবে কি না-এ নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

আরও খবর