সোমবার ২২ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ০২:৩৩

বেকারত্ব হ্রাসে প্রয়োজন কর্মমুখী শিক্ষা

Published : 2017-07-29 22:08:00, Updated : 2017-07-30 10:15:46
সাঈদ নিশান: যদিও শিক্ষার প্রকৃত অর্থ চাকরি নয়, কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে শিক্ষার অর্থ আত্মকর্মসংস্থানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আবার প্রকৃত শিক্ষার অর্থ এই নয় যে, পড়াশোনা শেষ করে বেকার থাকতে হবে! একটা দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা, মানুষের জীবনযাত্রার মানের ওপর নির্ভর করে শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি দারিদ্র্যপীড়িত দেশ। তবে দারিদ্র্যের হার অনেক কমলেও কাক্ষিত পর্যায়ে এখনও পৌঁছেনি। দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে, বাড়ছে পাসের হার, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বলা যেতে পারে শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন একেবারে কম নয়। এছাড়া নারী শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, জীবনযাত্রার মানেও যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটেছে। নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের পথে, এক কথায় বলা যেতে পারে দেশ ক্রমান্বয়ে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের মূল কারিগর হচ্ছে দক্ষ মানবসম্পদ। যদি বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা না যায় তবে কোনো দেশ টেকসই উন্নয়নের পথে যেতে পারে না।
মানুষের মেধা ও মননকে বিকশিত করার জন্য প্রয়োজন শিক্ষার। তাই মানুষকে সেই শিক্ষাই গ্রহণ করা উচিত, যে শিক্ষা তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনধারার উন্নয়নে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে অশিক্ষা ও অপরিকল্পিত পুঁথিগত শিক্ষাব্যবস্থার কারণে বেকারত্বের হার দিন দিন বেড়েই চলছে। এ দুরবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে জীবন সম্পৃক্ত উপার্জনক্ষম কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন জরুরি।
আমাদের দেশে স্বাধীনতার ৪৬ বছরে শিক্ষা ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া গবেষণাধর্মী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর যে হারে শিক্ষার্থী বের হয়ে আসছে সে হারে হচ্ছে না কর্মসংস্থান। ফলে আমাদের দেশে বেকার সমস্যার কার্যকর কোনো সমাধান হচ্ছে না। এর মূল কারণ হল বর্তমানে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও কোটা পদ্ধতি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা না পারছে একজন শিক্ষার্থীকে মানবিক করে তুলতে, না পারছে বেকারত্বের অবসান ঘটাতে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রতি বছর হাজার হাজার বেকারের জন্ম দিচ্ছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর মানবসম্পদ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নেই। কথিত বিসিএস, ব্যাংক জব, শিক্ষকতা, আইন পেশার কর্মী উত্পাদনের কারখানার রূপ নিয়েছে। বেকারদের বোবাকান্না, তাদের দুঃখ-কষ্ট আমাদের ব্যথিত করে। তাদের কান্না থামাতে না পারলে সামাজিক অস্থিরতা আরও বেড়ে যাবে। এছাড়া হতাশার কারণে তাদের প্রবল বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে যে ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে তাতে শিক্ষা প্রকৃতপক্ষে একজন মানুষকে মানবিক করার পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থানের পথও তৈরি করে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তাদের মেধা ও যোগ্যতা অনুসারে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে নিয়োজিত থেকে দেশ ও জাতির সেবা করার সুযোগ পায়। তাই সেসব রাষ্ট্রে যুগের চাহিদা অনুযায়ী এক ধরনের পরীক্ষিত শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকার ফলে বেকারত্বের হার এত কম।
আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় পাসের হার প্রায় শতভাগ হলেও আত্মকর্মসংস্থান ও বেকারত্ব দূরীকরণের কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা সমাজের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করতে পারছে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যদি সমাজ বদলানোর শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয় তাহলে গতানুগতিকতা সমাজকে অচল করে দেবে। পুরনো ধ্যান-ধারণায় পরিবর্তন এনে গতানুগতিকতা থেকে বের হতে না পারলে জরাজীর্ণতাকে কাটিয়ে মসৃণ, কল্যাণময় একটা সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে না। অথচ উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে কারিগরি কর্মমুখী শিক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। একটি গণমুখী উন্নত মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা বেকারত্বের অবসান ঘটিয়ে দেশকে দ্রুত টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যায়। উপরন্তু আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রস্তুত করতে হবে বাস্তবতার আলোকে।
বাংলাদেশ বিপুল জনসংখ্যার দেশ। কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে এ জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। দক্ষ জনশক্তি দেশের সম্পদ; উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। তাই আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার ঘটানো দরকার।   asayeedbd90@gmail.com