বুধবার ২৪ জানুয়ারি, ২০১৮, সকাল ১০:০২

জলজটে দিশেহারা শহরবাসী

Published : 2017-07-29 22:08:00
সোলায়মান মোহাম্মদ: জলজটে যানজটের সৃষ্টি হওয়ায় ১০ মিনিটের পথ যেতে ঘণ্টাখানেক লাগছে। রাজধানীর কোথাও বাদ নেই, সবাই একরকম পানিবন্দি অবস্থায় অসহায়ভাবে দিনাতিপাত করছে। ঘরে পানি, বাইরেও পানি। যদিও পানির অপর নাম জীবন; কিন্তু পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যে, এই পানির কারণেই এখন জনজীবন সীমাহীন দুর্ভোগে। চারদিকে পানি আর পানি। মনে হবে কোনো নদীর ওপর ভাসমান নগরী স্থাপন করে ঢাকাবাসী বাস করছে। কর্মক্ষেত্রে যেতে বাইক, প্রাইভেট কার কিংবা সকল যানবাহনই এখন শহরবাসীর কাছে অকেজো, প্রয়োজন শুধু নৌকার। সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমগুলোতে এ নিয়ে রসিকতার শেষ নেই। যে যেমন পারছে যার যার লোকালয়ের পানিবন্দিত্বের কাহিনি চিত্রসহ উপস্থাপন করছে। আমার পরিচিত এক কলেজশিক্ষক তার ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন-‘ও দরিয়ার পানি তোর মতলব জানি ... ভিজিয়ে দিলি কেন মোরে ঘরেতে ফিরি কেমন করে’। গানের কথাটি স্যার যথাসময়ে দুঃখ নিয়েই তার আইডিতে লিখেছেন।
কর্মজীবীরা কেউ হাঁটুপানি আবার কেউ কোমরপানিতে নেমে ভিজেই অফিসে যাতায়াত করছেন। অফিস থেকে যারা দূরে থাকেন তারা সময়মতো পাচ্ছেন না কোনো যানবাহন। আর পেলেও এক ঘণ্টার রাস্তা যেতে সময় লাগছে ৩-৪ ঘণ্টা। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত শিক্ষালয়ে যেতে পারছে না। এতে তাদের লেখাপড়ার মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। শহরের নিচু এলাকায় অফিস ও বাসাবাড়িতেও পানি উঠছে। এক কথায় জলাবদ্ধতায় শহরবাসীর জনজীবন থমকে গেছে।
গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরত্, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত এই ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল। ঋতু অনুযায়ী এই দুই মাস বৃষ্টি হবে, এটাই স্বাভাবিক। বিগত বছরগুলোতেও বর্ষাকালে একাধারে বৃষ্টি পড়ার কারণে শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এবার বিগত সকল বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করে জলাবদ্ধতার আকার ভয়াবহতায় রূপ নিয়েছে।  
কিন্তু কেন এই জলাবদ্ধতা, কেন শহরবাসীর পানিবন্দি জীবন? কেন এই মহাদুর্ভোগের সৃষ্টি? এর কারণ কি শুধুই বৃষ্টি, না রয়েছে আরও অনেক কারণ? শুধু বৃষ্টির কারণে এমন ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টির প্রশ্নই আসে না। চলুন উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ নিয়ে আলোচনা করা যাক। পানি নিম্নগামী, যা সমতা রক্ষা করে চলে। পানিপ্রবাহ নিষ্কাশনে বাধা পেলে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে, এটাই স্বাভাবিক। ঢাকার আশেপাশে একসময় প্রায় ৬৩টি নদী-নালা, খাল-বিল ছিল। বর্তমানে যার কয়েকটি ছাড়া প্রায় সবক’টিই প্রভাবশালীদের লোলুপ দৃষ্টির শিকার হয়ে মরে যেতে বাধ্য হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এই সমস্ত খাল ভরাট করে স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। ফলে পানি জমে থাকার নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা না পেয়ে একটু নিচু জায়গা বা সর্বত্রই আশ্রয় নিতে হচ্ছে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে জলজট। অন্যদিকে পানি নিষ্কাশনের যে মাধ্যম অর্থাত্ ড্রেনেজ ব্যবস্থা সেখানেও রয়েছে বিরাট সমস্যা। নগরবাসী তাদের খেয়ালখুশিমতো নিত্যব্যবহার্য আবর্জনার স্তূপ বিশেষ করে পলিথিন ও প্লাস্টিক যেখানে সেখানে ফেলে রাখছে। যেগুলো পরে সামান্য বাতাস বা বৃষ্টি হলেই পানি নিষ্কাশনের ড্রেনে এসে জমছে এবং ধীরে ধীরে সেখানে ময়লার স্তূপ জমে অকেজো হয়ে উঠছে। ফলে পানি নিষ্কাশনের বিকল্প কোনো পথ না থাকায় সৃষ্টি হচ্ছে এই জলাবদ্ধতা। এই সমস্যা দুয়েক দিনেই যেমন সৃষ্টি হয়নি, তেমনি স্বল্প সময়ে এর নিরসন করাও সম্ভব নয়।
ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নির্মাণ ও পয়ঃনিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থা না করলে এই সমস্যা নিরসনের কোনো উপায় নেই বলেই মনে করি। ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন স্থাপন, বক্স কালভার্ট নির্মাণ করতে হবে। সাময়িক পানি নিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য সার্বক্ষণিক পরিচ্ছন্নতা কর্মী থাকতে হবে। তাছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটি তা হল খাল-বিল, নদী-নালা ভরাট রোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে। সর্বোপরি সিটি মেয়রদ্বয়, ওয়াসা ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগেই কেবল এই পরিস্থিতি থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসা সম্ভব। অন্যথায় শহরবাসীসহ পর্যায়ক্রমে সারাদেশের মানুষকেই এর চরম মূল্য দিতে হবে। মহাসড়কগুলো পানির প্রকটে খানাখন্দে রূপ নিয়ে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হবে।