শনিবার ২০ জানুয়ারি, ২০১৮, সন্ধ্যা ০৭:১৪

৫৩ আসনে আওয়ামী লীগের রাজনীতি হাইব্রিডদের দখলে

Published : 2017-07-28 23:37:00
লায়েকুজ্জামান: হাইব্রিডদের দাপটে দেশের অনেক এলাকায় কোণঠাসা হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে রয়েছেন ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতারা। কম করে হলেও ৫৩টি আসনের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এখন হাইব্রিড নেতাদের হাতে। এসব এলাকার রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, টেন্ডার, হাটবাজার ইজারা নেওয়া ও পরিবহন ব্যবসা-সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছেন হাইব্রিড নামে নব্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।
তবে ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন দলীয় সভা-সমাবেশে হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান নিয়েছেন। এ নিয়ে তিনি গত মে মাসে দলীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় তোপের মুখে পড়ে ‘কাউয়া’ শব্দটি ব্যবহার না করতে গণমাধ্যমকর্মীদের অনুরোধ জানালেও হাইব্রিডদের সম্পর্কে অনড় অবস্থানেই রয়েছেন।
গত ২১ জুলাই গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায় স্বয়ং দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলে অনুপ্রবেশকারী ও অতিউত্সাহীদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ক্ষুব্ধ
প্রধানমন্ত্রী অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা প্রস্তুতেরও নির্দেশ দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের একাধিক জেলার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কম-বেশি প্রতিটি নির্বাচনী আসনেই দলে অনুপ্রবেশকারী আছেন। তারা এসেছেন বিএনপি ও জামায়াত থেকে। তাদের অনেকেই ঘটা করে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দলে যোগ দিয়েছেন। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৫৩টি আসনের রাজনীতিসহ টেন্ডার-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ করেন দলে অনুপ্রবেশকারীরা। দেখা গেছে, এসব জেলায় মন্ত্রী ও এমপিদের সরাসরি আশ্রয়-প্রশ্রয়ে হাইব্রিডরা ফুলে-ফেঁপে উঠেছেন। অনুপ্রবেশকারীদের হাতে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় সেখানে রাজনীতিবিমুখ হয়ে ঘরে বসে রয়েছেন আওয়ামী লীগের পুরনো ত্যাগী নেতারা।
বিগত পাঁচ মাসে একাধিক বৈঠক করার পরও দলের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নেতারা হাইব্রিড ও আসল আওয়ামী লীগের বিরোধপূর্ণ জেলাগুলোর বিবাদ মেটাতে পারেননি। এলাকাগুলোতে হাইব্রিডদের লালনকারী এমপিদের অনড় অবস্থানের কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না; বরং দিন দিন অনুপ্রবেশকারীদের দাপট আরও বাড়ছে।
ঝালকাঠির দুটি, জামালপুরের দুটি, পাবনার একটি, গাইবান্ধার দুটি, চট্টগ্রামের চারটি, ফরিদপুরের দুটি, রাজবাড়ীর একটি, কুষ্টিয়ার দুটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি, যশোরের একটি, ঢাকা জেলার দুটি, ঢাকা মহানগরের চারটি, দিনাজপুরের একটি, নীলফামারীর একটি, রংপুরের একটি, নরসিংদীর একটি, নারায়ণগঞ্জের একটি, মুন্সীগঞ্জের একটি, বরিশালের দুটি, নড়াইলের একটি, ফেনীর দুটি, চাঁদপুরের একটি, কুমিল্লার চারটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুটি, টাঙ্গাইলের দুটি, শেরপুরের একটি, ঝিনাইদহের দুটি, চুয়াডাঙ্গার একটি ও মেহেরপুরের একটি আসনের প্রায় আশিভাগ নিয়ন্ত্রণ হাইব্রিডদের হাতে। সেখানে নিষ্ক্রিয় হয়ে রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। তাদের অনেকেই একাধিক হামলা-মামলার আসামি হয়ে এলাকা ছেড়ে ঢাকায় অবস্থান করছেন।
স্বাধীনতাউত্তর কাল থেকে নরসিংদী শহরে আওয়ামী লীগের মূল শক্তি হিসেবে পরিচিত ভুঁইয়া পরিবারের ছেলে ছাত্রলীগ নেতা লেনিন এখন একাধিক মামলার আসামি হয়ে ফেরারি জীবনযাপন করছেন। পঁচাত্তর-পরবর্তীকালে দলের দুর্দিনে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন তার বাবা আমিরুল ইসলাম ভুঁইয়া। তার মা দীর্ঘদিন ধরে জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদিকা ছিলেন। সাবেক এক ছাত্রশিবির নেতাকে ছাত্রলীগের সভাপতি করার প্রতিবাদ করায় রোষানলে পড়তে হয় লেনিনকে। শুধু লেনিনের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে ক্ষান্ত হয়নি, তার মা মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রীর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা।
ঝালকাঠির রাজাপুরের কাঁঠালিয়ায় দাপটে রয়েছেন হাইব্রিডরা। সেখানে কোণঠাসা হয়ে রাজনীতি থেকে বহু দূরে অবস্থান করতে হচ্ছে দলের দুর্দিনের কর্মীদের। রাজাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাজমুল আহসান খসরু তালুকদারকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদেও মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। বাদ দেওয়া হয়েছে রাজনীতি থেকেও। একই অবস্থা রাজাপুরের পঁচাত্তর-পরবর্তীকালে প্রতিবাদী নেতা সরু মিয়ার। তাকেও ইউনিয়ন পরিষদে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তাদের বিপরীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে শিবিরের সাবেক  নেতা ও এক রাজাকারের সন্তানকে।
ঢাকা মহানগর উত্তরের দুটি থানার সভাপতি করা হয়েছে দুই হাইব্রিড নেতাকে। তাদের একজন এক সময় জড়িত ছিলেন চৈনিক ধারার বাম রাজনীতির সঙ্গে, আরেকজনের পরিবারের সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ওই দুই হাইব্রিড নেতা আবার আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন চান জামালপুরের দুটি আসন থেকে। নির্বাচনী এলাকায় অর্থ-বিত্ত খরচ করে ইতোমধ্যেই তারা দলকে দ্বিধাবিভক্ত করেছেন।
রাজবাড়ী-২ আসনের একটি উপজেলা আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক একই সঙ্গে এখন পর্যন্ত বিএনপিরও দফতর সম্পাদক। ২০০১ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর রুহের মাগফিরাতের জন্য আয়োজিত মিলাদের খাবার লাথি মেরে ফেলে দিয়ে সমালোচিত হওয়া যুবদল নেতাও এখন বালিয়াকান্দি আওয়ামী লীগের দাপুটে নেতা।
বালিয়াকান্দি উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা হারুনার রশিদ মানিক জানান, হাইব্রিডদের দলে আসার সুযোগ দেওয়ার প্রতিবাদে আমি উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছি। এলাকায় বিএনপি-জামায়াত ও চরমপন্থী দল থেকে প্রায় ৩০০ জনকে দলে নেওয়া হয়েছে, তারাই এখন দলের কর্ণধার হয়ে গেছেন।
এই নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা জেলা কমিটির সহ-সভাপতি খান আবদুল হাই ও উপজেলা কমিটির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ফরিদউদ্দিনসহ দলের পোড় খাওয়া নেতা আবুল হোসেন খান, আলীউজ্জামান টিটো চৌধুরীরা হাইব্রিডদের দাপটে চরমভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
একাধিক জেলার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রায় ২০০ নির্বাচনী এলাকায় দলীয় এমপিরা বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী ও চরমপন্থীদের অর্থের বিনিময়ে দলে ভিড়িয়ে নৌকার প্রার্থী করার কারণে এসব ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের ভেতরে স্থায়ী বিভক্তির সৃষ্টি হয়েছে।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন এ বিষয়ে জানান, দলে অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত। দলের সাধারণ সম্পাদক এ বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। হাইব্রিডরা দলে নানা কৌশলে প্রবেশ করছেন, এখন তাদের অনুপ্রবেশের বিষয়ে দল সজাগ হয়ে উঠছে।

 

আরও খবর