মঙ্গলবার ১৬ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ১১:৪৫

পরিবেশ উন্নয়নে ছাদে বাগান

Published : 2017-07-21 22:12:00, Updated : 2017-07-22 10:10:50
মো. ওসমান গনি: বিশ্বের জনসংখ্যার আনুমানিক শতকরা ৩৪ ভাগের বেশি মানুষ ২০৩০ সালের মধ্যে শহরে বসবাস করবে। এতে বাসস্থান ও অন্যান্য কাজে ব্যবহারের ফলে বহু ফসলি জমি হারিয়ে যাবে এবং পরিবেশ ও জলবায়ু হুমকির সম্মুখীন হবে। ফলে পৃথিবীতে প্রজাতির বিলুপ্তি, স্থান পরিবর্তন ও মানুষের সুষ্ঠু জীবন ধারণের সুযোগ-সুবিধা অনেকাংশে কমে যাবে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯০০ সালের চেয়ে বর্তমানে ১২ গুণ বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হচ্ছে, যা তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন কারণ রয়েছে যেমন অধিক জনসংখ্যা, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ, বন উজাড়, নগরায়ণ, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ইত্যাদি। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে শহরাঞ্চলের তাপমাত্রা গ্রামাঞ্চলের তুলনায় অধিক বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শহরে তাপদ্বীপ সৃষ্টি করছে। ফলে পরিবেশের ক্ষতি হয়ে মানুষের মারাত্মক রোগ-ব্যাধি ও অকালমৃত্যু হচ্ছে। আমরা সবাই জানি গাছপালা পরিবেশ উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখে। গাছ পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকারক কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং প্রাণিকুলের জন্য অক্সিজেন নিঃসরণ করে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে। গাছ লাগানো বা বাগানকরণ এমন একটি উপায়, যা শুধু পরিবেশ উন্নয়নের নিয়ামকই নয়; অধিকন্তু খাবার, আশ্রয়, ওষুধ ইত্যাদি সরববাহ করে থাকে।
ছাদ বাগান হল মানবসৃষ্ট সবুজ আচ্ছাদান-যা টবে, ড্রামে, রোপণকৃত গাছ যেকোনো আবাসিক, বাণিজ্যিক বা কলকারখানার ছাদে করা হয়ে থাকে। আমরা গ্রামাঞ্চলে সাধারণত বিভিন্ন স্থানে বাগান করে থাকি। যেমন বাড়ির আঙিনায়, রাস্তার পাশে, মাঠে ও অন্যান্য জায়গায়। কিন্তু শহর এলাকায় এই ধরনের বাগান করার পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় ছাদে বাগান করে এই সীমাবদ্ধতা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। ছাদে বাগান কার্যক্রমের আওতায় নগরের পরিবেশগত বর্তমান সমস্যা অনেকাংশে দূর করা সম্ভব, পাশাপাশি আসবে বাড়তি খাদ্যপুষ্টি ও অর্থ। বহির্বিশ্বের মানুষ অনেক আগে থেকেই ছাদে বাগান করে আসছে। বাংলাদেশ সরকারও এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এ ব্যাপারে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকা শহরে অপরিকল্পিতভাবে অল্পসংখ্যক ছাদবাগান করা হলেও তা ব্যাপকতা লাভ করেনি। ছাদে বাগান করে শহরে গাছপালা প্রবর্ধনের মাধ্যমে জীবের জন্য নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব। ছাদের বাগান বাতাসের গুণাগুণ উন্নয়ন করে। কারণ গাছপালা হচ্ছে পরিবেশের বিষাক্ত উপাদানের প্রাকৃতিক ছাঁকনি।
ছাদে ফুল-ফল, শাকসবজি, মশলা প্রভৃতি চাষাবাদের পাশাপাশি সুশীতল ছায়া পশুপাখির আশ্রয় স্থান নিশ্চিত করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধিকরণ উপাদান যেমন পার্টিকুলেট মেটার গাছের পাতায়, কাণ্ডে ও শাখায় লেগে থাকে বা পরবর্তীকালে সেচ ও বৃদ্ধির পানির মাধ্যমে মাটিতে চলে যায়। যার ফলে বায়ুর তাপমাত্রা হ্রাস পায়। এছাড়া গাছপালা গ্রীষ্ম তাপশোষণ ও শীতকালে তাপ বর্জন করে শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার কবল থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এ ছাদবাগানের মাধ্যমে। সেই সঙ্গে পরিবেশ সুশীতল ও শান্তিময় থাকে। সর্বোপরি বাড়ির শিশুরা বিষমুক্ত ফল ও শাকসবজি খেতে পারে।
এক গবেষণায় পাওয়া যায়, ছাদের বাগান বাইরের তাপমাত্রার চেয়ে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা প্রায় ১.৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হ্রাস করতে পারে, যা শীতলীকরণ চাহিদার জন্য বিদ্যুত্ খরচ কমায় এবং ছাদবাগানে ছাদের তাপমাত্রা ও ছাদবাগানবিহীন ছাদের তাপমাত্রার পার্থক্য ৭.৮৬ সে. হয়। আরও দেখা যায়, ছাদে বাগান বৃদ্ধির ফলে পানি ধরে রাখা শহরে কৃষি সম্প্রসারণ তথা ফুল-ফল ও শাকসবজির চাহিদা পূরণসহ আয়ের উত্স ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। এটি সামাজিক সম্পর্ক শিক্ষা গবেষণা এবং খাদ্য উত্পাদনের মাধ্যমে শহরে কৃষির একটি মডেল হতে পারে। পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে বাড়ির ছাদে যেকোনো গাছ, এমনকি শাকসবজি ফলানো সম্ভব।
গ্রিনহাউস গ্যাস শোষণ এবং অক্সিজেন নির্গমনের মাধ্যমে নির্মল পরিবেশ নিশ্চিত হবে। রাসায়নিক বিষমুক্ত টাটকা শাকসবজি ও ফলমূল পাওয়া যাবে, সেটি আপনার পরিবারের লোকজন, বিশেষ করে শিশুরা নির্ভয়ে খেতে পারবে। শহরে অবকাঠামে নির্মাণের জন্য অথবা দৈনন্দিন প্রয়োজনে প্রতিনিয়তই আপনি পরিবেশের দূষণ ঘটিয়ে যাচ্ছেন। তাই প্রকৃতির কাছে আপনি দায়বদ্ধ। আপনার কাজের মাধ্যমে সে দায় কতটুকু মেটাতে পেরেছেন? তাই বাগান করার মাধ্যমে আপনি কিছুটা হলেও দায়মুক্ত হতে পারেন। এছাড়াও পরিবেশ রক্ষা ও দূষণ রোধে এবং সৌন্দর্য বর্ধনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে এ ছাদবাগান।
আজকাল বিভিন্ন নার্সারিতে বেটে জাতের ফলের চারা পাওয়া যায়, যা ছাদে চাষ করার জন্য উপযোগী। আমরা ক্ষেতে খামারে যেসব শাকসবজি, ফল-ফুল ও বাহারি গাছের চাষ করে থাকি তার প্রায় সবই ছাদে চাষ করা যায়। তবে বিশেষ বিশেষ প্রজাতির গাছ ছাদে চাষ করার জন্য অধিক উপযোগী। সাধারণত যেসব প্রজাতির গাছ/ফসল ছাদে চাষ করা যেতে পারে তা হল ফুলের মধ্যে গোলাপ, গাঁদা, ডালিয়া, বেলী, রজনীগন্ধা, নয়নতারা, অফিস ফুল, চন্দ্রমল্লিকা, জারবেরা, অর্কিড, ক্যাকটাস, রঙ্গল, চাইনিজ পাম, ক্যাবেজ পাম এবং বিভিন্ন ধরনের বাহারি গাছের চাষ করা যেতে পারে। শাকসবজির মধ্যে টমেটো, শিম, কপি, পালংশাক, বেগুন, ঝিঙ্গা, মরিচ, কলমীশাক, পুঁইশাক, লেটুস, বাটিশাক, পেঁয়াজ, করলা, বরবটি, রসুন, শসা, বিলাতি ধনে ইত্যাদি সবই চাষ করা যেতে পারে। ফলের মধ্যে আম, পেয়ারা, আমড়া, লেবু, কুল, জামরুল, কমলা, স্ট্রবেরি, ডালিম, মাল্টা, করমচা, বাতাবি লেবু, সফেদা, আঙ্গুর, জামরুল, কামরাঙ্গা ইত্যাদি ফলের চাষ করা যেতে পারে।
গাছ লাগানোর টব, ড্রাম, বা পাত্র : ছাদে যেহেতু মাটি নেই তাই সেখানে পাকা হাউস, কাঠের স্ট্রাকচার, হাফ ড্রাম, টব, রঙের ড্রাম, বালতি, পানি বা সয়াবিন তেলের প্লাস্টিক বোতল ইত্যাদি পাত্রে জৈব সারসমৃদ্ধ মাটি ভরাট করে সেখানে গাছ জন্মানো হয়। প্লাস্টিক বা মোটা কাপড়ের ব্যাগেও গাছ লাগানো যেতে পারে। গাছের আকার অনুসারে টবের আকার ছোট-বড় হতে পারে। মোট কথা, এসব কিছু ব্যক্তির উদ্ভাবনী চিন্তা, অভিজ্ঞতা, উপকরণের প্রাপ্যতা, সামর্থ্য ইত্যাদির ওপর নির্ভর করবে। অন্যদিকে যারা ভাড়া বাসায় থাকেন অথবা একটি ফ্ল্যাটের মালিক, ছাদে বাগান করার সুযোগ নেই তারা তাদের ব্যালকনিতেই ক্ষুদ্র পরিসরে সুন্দর বাগান গড়ে তুলতে পারেন।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
pressgani.simplesite.com