শনিবার ২০ জানুয়ারি, ২০১৮, ভোর ০৫:৪২

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন

Published : 2017-07-20 19:35:00
শরীফুর রহমান আদিল
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর নির্মমতার শেষ যেন থামছেই না, আর কোনোভাবেই এই নির্মমতাকে প্রকাশ করা যাচ্ছে না। নারীদের ধরে নিয়ে বিবস্ত্র করে জোরপূর্বক গণধর্ষণ, পরিশেষে রক্তাক্ত আর মুখের সামনে থেকে গুলি করে হত্যা, মায়ের সামনেই নিজ শিশুকে নদীতে নিক্ষেপ করে আর মাকে উলঙ্গ করে শরীরের স্পর্শকাতর জায়গায় নির্যাতন, সিগারেটের আগুন নিক্ষেপ! মায়ের কোল থেকে অবুঝ বাচ্চাকে কেড়ে নিয়ে আগুনে নিক্ষেপ!  কিংবা বসত বাড়িতে আগুন লাগিয়ে নিবানোর নামে পানির পরিবর্তে পেট্রল নিক্ষেপ! ১০ বছরের ওপর যেকোনো পুরুষ নারী হলেই সবার একই অবস্থা বরণ করতে হবে আর ১০ বছরের নিচে হলেই তাদের আগুনে কিংবা নদীতে নিক্ষেপ! একটা দলকে ধরে নিয়ে নির্জন বনে কিংবা নদীর পাশে এক রশিতে বেঁধে একজনের ওপর অন্যজনকে উলঙ্গ অবস্থায় শুয়ে থাকতে বলা, তাদের পানির পরিবর্তে প্রস্রাব পান করানো, সবই এখন মিয়ানমারের এক সময়ের স্বাধীন আরাকান রাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো বাস্তব চিত্র। আফগানিস্তান কিংবা ইরাকের হামলার পর আমরা গুয়ান্তানামো বে কারাগারের নির্যাতনের কথা শুনেছি, কিন্তু বর্তমান মিয়ানমারের আর্মির রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত বর্বর নির্যাতন সেই কারাগারকেও যেন ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অন্যভাবে বলা যায়, এটি মনে হয় গুয়ান্তানামো বে কারাগারের আধুনিক সংস্করণ! যেখানে কারাগার নামকরণ না করলেও শত শত গ্রামকে তারা কারাগারের আদলে ব্যবহার করছে নির্ভয়ে কিংবা নির্লজ্জভাবে। যেখানে কোনো গণমাধ্যমের যাওয়ার সুযোগ নেই, নেই কোনো মানবাধিকার সংগঠনের স্বাধীন তদন্ত করার সুযোগ। এই নির্মম মানবতা আর মানবাধিকার লঙ্ঘনে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম তাদের ইজ্জত, সন্তান-সন্ততিকে বিসর্জন আর নিজের নিকট থাকা টাকা পয়সা বিসর্জন দিয়ে বাংলাদেশসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সীমান্তে এসে হাহাকার আর আর্তনাদ করছে। কিন্তু কেউ যেন কারও নয়, মানবতা যেন মুসলমানদের জন্য নয়-এই নীতিতে অটল। একমাত্র চীন, বাংলাদেশ আর তুরস্ক ছাড়া সবাই যেন চাচ্ছে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা আয়লানের মতো ভেসে যাক! আর এই মানবতার সুযোগ নিয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা কিংবা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার বাংলাদেশের প্রতি সীমান্ত খুলে দেওয়ার অনুরোধ করছে। কিন্তু তাদের এই অনুরোধের প্রেক্ষিতে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাসহ মানবাধিকার সংস্থাগুলো মিয়ানমারের বৌদ্ধ সরকারের নীতি বাস্তবায়নে কি বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ কিংবা আশ্রয় প্রদানে অনুরোধ করছে? কেন এসব সংস্থা মিয়ানমার সরকারকে তাদের এই লোমহর্ষক নির্যাতন বন্ধে আহ্বান জানায় না? কেন মিয়ানমার সরকারকে এসব সংস্থা সমাধানে কোনো চাপ প্রয়োগ করতে পারে না? কেন বারবার বাংলাদেশ সরকারের প্রতি তাদের অনুনয় আর বিননয়? নাকি বাংলাদেশের আবেগ নিয়ে খেলা করতে তারা অভ্যস্ত? বাংলাদেশই কি কেবল মানবতাবোধ দেখাতে পারে, অন্যদের মধ্যে কি সেই মানবতাবোধ নেই? ফলে মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কি রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে মানবতাকে একাকার করে ফেললাম? নাকি মানবতা হবে ধর্মকেন্দ্রিক? তবে কেন মধ্যযুগকে আমরা অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ বলে গালি দিই? মধ্যযুগকে আমরা অন্ধকার যুগ হিসেবে বিবেচনা করি কারণ সে সময়ে সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ  করত ধর্মকেন্দ্রিক, কিন্তু কেউ কি বলতে পারবে এখনকার সময়ে ধর্মের দ্বারা সবকিছু নিয়ন্ত্রিত নয়? যে মানবতাবাদের জয়গান নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উদ্ভব হয়েছিল আধুনিক যুগের, সেই মানবতা মিয়ানমারের ক্ষেত্রে উপেক্ষিত কেন? কেন সারা বিশ্ব একচোখা মানবতাবাদ সমর্থন করে? নাসিরনগরে হামলার প্রেক্ষিতে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত কিংবা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেই উদ্বেগ আজ কোথায়? বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মুসলমান সম্প্রদায়, বলতে গেলে বাংলাদেশের সব মানুষ বিশ্বের যেকোনো মুসলিম জাতির সমস্যা হলেই তার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে, সেই অনূভূতিকেই কি তারা পুঁজি করে কেবল বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা আশ্রয় দিতে বারবার চাপ? একদিকে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ আর অন্যদিকে এই দেশের ৯০ শতাংশ মুসলিম অধিবাসী হওয়ায় এসব সংস্থা তাদের আবেগ, টান কিংবা অনুভূতিগুলো সম্পর্কে জেনেই তাদের বারবার এই অনুরোধ! জাতিসংঘসহ তাদের শরণার্থী সংস্থাগুলো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা পরিচালনার অভিযোগ তুলছে, কিন্তু মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে হেগে বিচার চাওয়া হচ্ছে না কেন? কেন আজ মিয়ানমারকে সন্ত্রাসবাদী দেশের অন্তুর্ভুক্ত করে মার্কিন কিংবা ন্যাটোর ড্রোন হামলা পরিচালনার সঙ্কল্প নেওয়া হচ্ছে না?  নাকি এসব মুখস্থ বুলি ছেড়ে নিজেদের দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করছে এসব সংস্থা? কে জানে শান্তিতে নোবেল পাওয়া সু চি ও কৃতকর্ম দেখে কবরদেশের বাসিন্দা আলফ্রেড হাহাকার আর আর্তনাদ করছে কিনা?
প্রায় ৭৪ বছর ধরে রোহিঙ্গারা থেমে থেমে এসব লোমহর্ষক নির্যাতনের শিকার এবং প্রায় ২৭ বার মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর তাদের সমূলে উচ্ছেদ কিংবা নিঃশেষ করতে অভিযান পরিচালনা করে। এই ৭৪ বছরে জাতিসংঘ, ওআইসি কিংবা মানবাধিকার সংস্থাগুলো এসব রোহিঙ্গা রক্ষায় কিংবা স্থায়ী সমাধানে কার্যকরী কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি। যখনই এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তখনই কেবল বাংলাদেশ তার সীমানা খুলে দিয়েছে। কিন্তু এবার বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে কার্পণ্য করছে বলে মনে হয় না, তবে সতর্ক বলতে হবে, কেননা বিগত বছরগুলোর রোহিঙ্গাদের কৃতকর্ম কিংবা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে কৃতকর্মের দায়ভার এখনও বাংলাদেশ বহন করছে, সৌদি আরবের শ্রমবাজার এখনও বাংলাদেশের জন্য বন্ধ। আমাদের মনে রাখতে হবে আশ্রয় প্রদান কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানে স্থায়ী ও টেকসই উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বোপরি যে উদ্দেশ্য নিয়ে আধুনিক যুগের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই মানবতাবোধের সবর্ত্রই জয় হোক, এই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : শিক্ষক, ফেনী সাউথ ইস্ট ডিগ্রি কলেজ
adil_jnu@yahoo.com