মঙ্গলবার ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, রাত ১০:২৩

মেরিন ড্রাইভকে ঘিরে পর্যটন সম্ভাবনা

Published : 2017-07-17 23:46:00, Count : 111
ড. হুমায়ুন কবীর: পর্যটন মানে পরিব্রাজন, ভ্রমণ। পর্যটন মানে বেড়ানো। বেড়ানোর মাধ্যমেও অনেক সময় অনেক কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে। এ পর্যটন করতে গিয়েই কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন। এ সম্পর্কে অনেক বেদবাক্য জনশ্রুতি হিসেবে রয়েছে। ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে দুই পা ফেলিয়া, একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু’ তেমনি একটি জনশ্রুতি। এসব কথার একটি অন্তর্নিহিত তাত্পর্য রয়েছে। সেটি হল আমরা সাধারণত বেড়ানো বলতে শুধু বিদেশ-বিভুঁইকে বুঝে থাকি। কিন্তু আমাদের দেশের অভ্যন্তরে যে কত-শত সুন্দর সুন্দর উপভোগ্য স্থান রয়েছে, সেটা মানতে পারি না। এ প্রসঙ্গে এখানে আমি একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরার চেষ্টা করব।
আমি সম্প্রতি আমার নিজের কর্মস্থল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নেতৃত্বে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের একটি পর্যটক দল নিয়ে বাংলাদেশের পর্যটন নগরীখ্যাত কক্সবাজারে পরিভ্রমণ করি। সেখানে ভ্রমণের একপর্যায়ে বিভিন্ন জনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার সময় একজনকে বলতে শুনেছি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা। সেখানে রিকশায় চড়ার সময় মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। তখন সেই রিকশাওয়ালা বলে উঠল, ‘এত দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ যে কেন এখানে ছুটে আসে বুঝি না। কী আছে এ বালি ও নোনা পানির ভেতর! কই আমরা তো জন্মের পর থেকে এখানেই আছি, তা তো কিছুই আমরা পাই না।’ আবার যদি আরেকটি কথা চিন্তা করি তাহলে তা কেমন হবে! প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পর্যটন নগরী কক্সবাজারে যায়। তারা দু’-চার দিনের জন্য সেখানে গিয়ে মানসিক উত্তেজনার মধ্যে কাটায়। কিন্তু যারা সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা কিংবা যারা চাকরির পোস্টিং নিয়ে সেখানে যায় তারা হয়তো পর্যটকদের মতো উত্তেজনা অনুভব করবে না, সেটাই স্বাভাবিক।
যা হোক, পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা মনের খোরাক জোগাড় করে এবং ভ্রমণের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে থাকে। আমাদের দেশে যে অনেক পর্যটন সম্ভাবনা রয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বৃহত্তর সিলেটের চা বাগান, সিলেট ও কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা, সারাদেশের বিভিন্ন পুরাকীর্তি, ঐতিহাসিক স্থানসমূহ, বিশ্ব ঐহিত্য হিসেবে সুন্দরবন, সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটা, সিলেটের লাউয়াছড়া প্রাকৃতিক বনাঞ্চল, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, পাহাড়, নদী, খাল-বিল ইত্যাদি কত না কী। চট্টগ্রামে রয়েছে পতেঙ্গা সি-বিচ। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। এটির দৈর্ঘ্য হল প্রায় ৯৬ মাইল বা ১২০ কিলোমিটার।
সম্প্রতি এর সৌন্দর্য সঠিকভাবে উপভোগ করার সুযোগ সৃষ্টির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজার জেলা সদর থেকে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি দৃষ্টিনন্দন দুই লেনের আধুনিক সড়ক উদ্বোধন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন করছেন, দেশবাসীর সঙ্গে আমিও খবরটি মিডিয়ার কল্যাণে তখনই জানতে পেরেছি। এটি দেশের উন্নয়ন পরিক্রমায় আরেকটি সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করে তখন আমার একটি কলামে লিখেছিলাম। কিন্তু তখন এটি সম্পর্কে সত্যিকার অর্থে আমার পুরোপুরি কোনো ধারণা ছিল না। আমি মনে করেছিলাম, হয়তো সমুদ্রে কোনো স্টিমার বা জাহাজ দিয়ে ড্রাইভ হবে। আমার মনে হয় দেশের অনেকেরই হয়তো একইরকম অনুমান কিংবা ধারণা হতে পারে।
সেজন্য এবার যখন আমি আমার পরিবারসহ সহকর্মীদের নিয়ে কক্সবাজারে মেরিন ড্রাইভে যাব বলে ঠিক করেছি, তখনও আমার একই ধারণা বিরাজমান ছিল। যখন সেখানকার বিশেষ ধরনের চান্দের গাড়িখ্যাত খোলা জিপে করে সারাদিনের জন্য ৮০ কিলোমিটার রাস্তা আসা-যাওয়ার জন্য উঠি তখন আমার ভুল ধারণা ভাঙে। সে এক অসাধারণ অনুভূতি। আমরা সবাই মিলে প্রায় ৩৬ জনের মতো ছিলাম। তিনটি চান্দের গাড়ি ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ি বহু প্রত্যাশিত ও প্রতীক্ষিত মেরিন ড্রাইভে। আমাদের আগ্রহের কাছে দিনভর মুষলধারে বৃষ্টি কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। সেখানে গেলে কী যে এক অনুভূতির সৃষ্টি হয় তা বলে বোঝানো কঠিন। গর্বে বুকটা ফুলে উঠে এই ভেবে যে আমাদের বাংলাদেশে এমন একটি পর্যটন সম্পদ রয়েছে। পুরো ৮০ কিলোমিটার রাস্তা ধরেই চোখের দৃষ্টি অন্যত্র ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।
কক্সবাজার থেকে টেকনাফ সীমান্ত হয়ে সাবরাং জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত এ মেরিন ড্রাইভের রাস্তাটি। কক্সবাজার থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উষ্ণ উত্তেজনা। উত্তেজনার প্রধান কারণ ও আকর্ষণ ছিল যাওয়ার পথে রাস্তার বাম পাশে পাহাড় আর ডানপাশে সাগর। সাগরের ছোট ছোট ঢেউ মনের গহিনে তীব্র সমুদ্রের বিশালত্বের আনন্দের অনুভূতি এনে দিচ্ছিল বারবার। অপরদিকে পাহাড়গুলো মনে হল পর্যটকদের দিকে মাথা হেলিয়ে কুর্নিশের ভঙ্গিতে তাকিয়ে রয়েছে। নতুন নির্মিত রাস্তাটিতে এমনভাবে যেন গাড়ি চলছে, যেখানে পিনপতনের শব্দ ও ঝাঁকুনিটি পর্যন্ত নেই। মনে হল পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য এমন একটি উদ্যোগেরই প্রয়োজন ছিল এতদিন।
উপাচার্য মহোদয়সহ একটি চান্দের গাড়িতে সপরিবারে আমরা ১২ জন উঠেছিলাম। গাড়িতে যাওয়ার সময় আমরা উত্তেজনায় একেক জন একেক কথা বলছিলাম। ডানপাশে সাগরের অংশে মাঝে মাঝেই ঝাউ গাছের সারি। জানা গেছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর বঙ্গবন্ধুই নাকি সাগরের কূল রক্ষার জন্য সারি সারি ঝাউবন সৃজন করেছিলেন। ঝাউবন দুটি কাজ করে থাকে। একটি হল সামুদ্রিক ঝড়ের বাতাস থেকে কিছুটা হলেও উপকূলবাসীকে রক্ষা করে থাকে, অপরদিকে ঢেউয়ের তোড়ে যাতে পাড় ভাঙতে না পারে সেটির নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে থাকে। অনেককে বলতে শুনেছি, সাগর, পাহাড় ইত্যাদি স্থানে নাকি শুষ্ক বা শীতকালে বেড়াতে হয়। কিন্তু বর্ষাকালে যে অন্যরকম অভিজ্ঞতা সেটা সেসময় সেখানে গিয়েই বুঝতে হবে। যদি মানুষের কথা শুনে ভয়ে এ সময়ে সেখানে বেড়াতে না যেতাম তাহলে আরেকটি অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত থেকে যেতাম।
এমনিতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য প্রথাগত লাবণী পয়েন্ট, কলাতলী পয়েন্ট, সুগন্ধা পয়েন্ট এবং একটু অদূরে ইনানী ও হিমছড়ি বিচের দিকেই পর্যটকদের ঢল সবচেয়ে বেশি। আর সেজন্য এসব বিচ পয়েন্টকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন তারকাবিশিষ্ট হোটেল, মোটেল, রেস্ট হাউস ইত্যাদি গড়ে উঠেছে। বেড়ানোর জায়গার তুলনায় পর্যটক সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে এসব স্থানে অনেক ভিড় হয়ে পড়ে। কিন্তু মেরিন ড্রাইভের মাধ্যমে যে রাস্তা করা হয়েছে সেখানে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৮০ কিলোমিটার একসঙ্গে সমুদ্র ও পাহাড় দর্শন একত্রে হয়ে যাচ্ছে। সেখানে যেতে যেতে সৈকতে সাম্পান নৌকার মাধ্যমে মাছ ধরার দৃশ্য দেখার দৃষ্টান্ত বিরল।
পৃথিবীর এমন অনেক দেশ আছে, যেখানে তাদের মোট দেশজ অর্থনীতির প্রধান আয় আসে পর্যটন খাত থেকে। দূরদেশ ইউরোপ-আমেরিকা ছাড়াও আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, চীন ইত্যাদি প্রধান। বাংলাদেশের যে পর্যটন সম্ভাবনা রয়েছে সর্বশেষ সম্ভাবনাময় সংযোজন হল এ মেরিন ড্রাইভ। এখন সেখানে প্রয়োজন শুধু দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য তাদের উপযোগী সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ভৌত অবকাঠামো তৈরি করা।
একটি জিনিস আমরা সবাই জানি, পর্যটন একটি বিরাট খাত। সেখানে শুধু সরকারের পক্ষে সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা সম্ভবপর নয়। বিশ্বের কোনো দেশেই তা একা সরকারের পক্ষে সম্ভবপর হয়ে উঠেনি। সরকার শুধু একটি পথ বাতলে দিতে পারে মাত্র। কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভের রাস্তাটি তৈরি করে দেওয়া সেই উদ্যোগেরই একটি অংশ মাত্র। সরকার সেখানে সে কাজটিই করে দিয়েছে। কাজেই এ খাতের দ্রুত উন্নয়নের জন্য ব্যাপক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। সেটির উন্নয়নের দায়িত্ব নিতে হবে বেসরকারি খাতকেই।
সেখানে বেসরকারিভাবে পর্যটকদের জন্য বিনিয়োগ করে ব্যাপক লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আশি কিলোমিটার রাস্তার পাহাড়ের অংশে অনেক ফাঁকা জায়গা রয়েছে, যেখানে ইচ্ছে করলেই পরিকল্পিতভাবে পর্যটনবান্ধব স্থাপনা, বিনোদনকেন্দ্র ইত্যাদি গড়ে তোলা সম্ভব। সরকার শুধু এসবের জন্য সহায়ক নীতিমালা প্রণয়নসহ তদারকি করবে। তবে আমরা মেরিন ড্রাইভের সময় রাস্তার পাশে কিছু দখলি সাইনবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন ইত্যাদি দেখেছি। এগুলো যদি সত্যি সত্যি পরিকল্পিতভাবে পর্যটন সহায়ক স্থাপনা তৈরির উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে তাহলে তো কোনো কথাই নেই। আর যদি সেগুলো অবৈধ দখলদার হয়ে থাকে তাহলে কোনো বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টির আগেই সেগুলোর বিষয়ে সরকারকে কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। তা না হলে পর্যটনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা শুরুতেই হোঁচট খাবে।
এমনিতেই বিভিন্ন অজুহাতে সারাদেশে সরকারি সম্পত্তি ও জায়গা দখলের যেমন মহোত্সব চলে এখানে যেন তা না হয় দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সচেতন সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। আমি এখন থেকে মাত্র ৫ বছর আগে ২০১২ সালে একবার কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলাম। মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার শহরের। এখনকার ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী আরও ৫-১০ বছরে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এভাবেই বাংলাদেশ এখন তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ থেকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে চলেছে। সেই ধারা আরও বেগবান হয়ে পুরো বাংলাদেশ একটি পর্যটন নগরীতে পরিণত হোক-এটাই তো আমাদের স্বপ্ন হওয়া উচিত।  
লেখক : ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
hkabirfmo@yahoo.com