মঙ্গলবার ২৫ জুলাই, ২০১৭, দুপুর ১২:৩১

১৪ হাজার কোটি টাকার তিন প্রকল্প: চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে তিন সংস্থার দ্বন্দ্ব চরমে

Published : 2017-07-17 23:16:00, Count : 90
মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন: চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনসহ তিন সংস্থা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার তিনটি প্রকল্প প্রস্তাব দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। পৃথকভাবে উত্থাপন করা হলেও ওই তিন সংস্থার প্রস্তাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজের ধরনের যথেষ্ট মিল রয়েছে। অথচ তিনটি সংস্থাই তাদের নিজ নিজ প্রস্তাব অনুমোদন করাতে জোর তদবির চালাচ্ছে। এ কারণে সংস্থাগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্বও এখন চরমে।
সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) তাদের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প প্রস্তাবে ৫ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে। আবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনও নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার আরেকটি প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড নগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে দাবি করছে ২ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে সিডিএর জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ সংস্কার প্রকল্প এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের ‘মহানগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা নিরসন ও নিষ্কাশন উন্নয়ন শীর্ষক দুটি প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে যাচাই-বাছাই হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের মূল ডিপিপি এখনও তৈরি না হলেও প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (পিডিপিডি) পাঠিয়ে দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে।
প্রকল্পের কাজের ধরন : তিন সংস্থাই নিজ নিজ প্রস্তাবে মহানগরীর ৩৬টি খাল পুনঃখনন করে জলাবদ্ধতা নিরসনের কথা উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, প্রতিরোধ দেয়াল, স্লুইস গেট নির্মাণের কথা বলা হয়েছে তিনটি প্রকল্প প্রস্তাবেই।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন দাবি করছে, নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাদের। এ যুক্তিতে সিডিএ’র প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুমোদন না দিতে ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে একাধিক চিঠি পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। আবার সিডিএ বলছে,
প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়ার পরই তারা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে। অন্যদিকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামে ওয়াসার ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা-২০১৬ অনুযায়ী মহানগরীর বন্য নিয়ন্ত্রণ ও জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ’র প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে একটি চিঠি পাঠিয়েছে সিটি করপোরেশন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, মহানগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা করপোরেশনের অন্যতম কাজ। গত অর্থবছরে নগরীর বিদ্যমান ৩৬টি খালের মাটি উত্তোলন ও অপসারণ কাজের জন্য ১৮ কোটি টাকার কাজ চলমান রয়েছে। তাছাড়া জাপানের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মহেশ খাল, সুরভী খাল, ডাইভারশন খাল সংলগ্ন রাস্তা ও প্রতিরোধ দেয়ালের কাজ চলমান রয়েছে। ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে আটটি ব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নিজস্ব ১২টি এস্কেভেটর, ৫০টি ড্রাক ও চারটি পে-লোডার দিয়ে নগরীতে বিদ্যমান খালগুলো থেকে প্রতিনিয়ত মাটি উত্তোলন ও মাটি অপসারণের কাজ চলমান রয়েছে। এ অবস্থায় সিডিএ’র প্রস্তাবিত প্রকল্পের সঙ্গে এসব কাজের মতদ্বৈধ সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের স্বার্থে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন চীনের সরকারি প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়নার সঙ্গে ২৭টি স্লুইস গেট, বড় খালগুলোর দু’পাশে প্রতিরোধ দেয়াল, রাস্তা ও ব্রিজ নির্মাণ এবং খাল খননের জন্য ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
সিডিএ’র প্রস্তাবিত প্রকল্পের প্রস্তাবনা নিয়ে গত ১৬ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিটি করপোরেশনের আপত্তি সত্ত্বেও প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় উত্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা। সিডিএ’র প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালের মাটি খনন করা হবে ৫ লাখ ২৮ হাজার ২১৪ ঘনমিটার। একই সঙ্গে এসব খালের ৪ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার কাদা অপসারণ করা হবে। ৯৮ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা হবে ১ লাখ ৭৬ হাজার মিটার। ওই প্রকল্পে ৮৬ কিলোমিটার রাস্তা, ৪৮টি পিডি ব্রিজ এবং ছয়টি কালভার্ট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই প্রকল্প বিষয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম জানান, প্রকল্পটি একনেকের বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তিনি আরও জানান, সিডিএ’র প্রস্তাবিত প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি রয়েছে। সম্মতি আদায়ের পরই প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
অন্য সংস্থার প্রকল্পের সঙ্গে কাজের অমিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অন্য কোনো প্রকল্পের সঙ্গে প্রস্তাবিত প্রকল্পের মতবিরোধ হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের পর মতবিরোধ দূর করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, নৌ-বাহিনী, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, সিডিএসহ বেশি কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে কথা বলে বাস্তবসম্মতভাবে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে, যা এখন পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। ওই প্রকল্পের আওতায় কর্ণফুলী নদীর ডান তীরে প্রতিরোধ দেয়ালের মাধ্যমে জোয়ার, ঝড়, বন্যা ইত্যাদি থেকে চট্টগ্রাম শহর রক্ষা, স্লুইস গেট নির্মাণের মাধ্যমে শহর এলাকায় লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ রোধ করা হবে। আবার পাম্প হাউস স্থাপনের মাধ্যমে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা এবং জমে থাকা বৃষ্টির পানি যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা হবে ২ দশমিক ৭০ কিলোমিটার, ৪০টি রেগুলেটর (১০টি পাম্প হাউসসহ) নির্মাণ করা হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হবে ২৭ কিলোমিটার। খাল পুনঃখনন করা হবে ২৫০ কিলোমিটার (৮২ লাখ ঘনমিটার)। এসব কাজে ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে ৬ হেক্টর। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা এড়িয়ে যেতে প্রকল্পে বাঁধ নির্মাণের পরিবর্তে দেয়াল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাঁধ নির্মাণ করতে ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হয়।