মঙ্গলবার ২৫ জুলাই, ২০১৭, দুপুর ১২:৩০

পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের জনসচেতনতা কার্যক্রমে ভাটা

Published : 2017-07-17 23:04:00, Count : 105
দিলরুবা সুমী: জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এখন দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর উত্পাদিত অধিকাংশ পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির উপকরণই সরবরাহ করছে সরকার। কিন্তু এসব উপকরণ ব্যবহারের জন্য জনসচেতনতা কার্যক্রমের অনেকটাই ভাটা পড়েছে। এখন আর পরিবার পরিকল্পনার বিষয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে সচেতন করার কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়ে না।
ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ও মোট প্রজনন হার গত সাত বছর ধরে একই আছে। বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩৭ ভাগ। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হারও গত প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে ৬২ ভাগেই স্থির আছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী এ অবস্থা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সব লক্ষ্য অর্জনকে ব্যর্থ করে দিতে পারে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের কর্মকর্তাদের মতে, সচেতনতা কার্যক্রমের ভাটার জন্য বাজেট স্বল্পতা আর জনবল সঙ্কটই দায়ী।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের উপকরণ ও সরবরাহ শাখার উপ-পরিচালক সাবিনা পারভীন সকালের খবরকে বলেন, সারাদেশে মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির বিভিন্ন উপকরণ সরকার সরবরাহ করে থাকে। এগুলো মূলত শহরের বাইরে সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে সরকারিভাবে মাসে প্রায় তিন কোটি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির অস্থায়ী বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অস্থায়ী পদ্ধতি ইমপ্ল্যান্ট বাদে বাকি প্রায় সব উপকরণই ২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান
উত্পাদন করে থাকে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ইডিসিএল এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রেনেটা, পপুলার, ইনসেপটা, টেকনো ড্রাগস ও জেএমআই সব ধরনের অস্থায়ী পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির উপকরণ উত্পাদন করে থাকে। দেশে ব্যবহূত সিঙ্গেল রডের ইমপ্ল্যান্ট সারা বিশ্বে একমাত্র নেদারল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠান অর্গানন উত্পাদন করে থাকে। তারাই সারা বিশ্বে এটা সরবরাহ করে।
তিনি জানান, বাংলাদেশে খাবার বড়ি ও ইনজেকশন প্রায় এক কোটি করে দুই কোটি সরবরাহ করা হয়। আর অন্যান্য উপকরণ আরও এক কোটির বেশি সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অস্থায়ী পদ্ধতি আইইউডি ২৫ হাজার ও ইমপ্ল্যান্ট ৪০ হাজার সরবরাহ করা হয়। অস্থায়ী পদ্ধতির মধ্যে ইনজেকশন জনপ্রিয় হচ্ছে।
অধিদফতরের আইইএম বিভাগের পরিচালক মো. ফেরদৌস আলম সকালের খবরকে বলেন, ১৯৭৫ সালে প্রায় ৫২ হাজার পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে জন্মনিয়ন্ত্রণে সচেতন করত। তখন প্রত্যেক পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার অধীনে থাকত ৫০০ দম্পতি। কিন্তু এখন একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাকে প্রায় দেড় হাজার দম্পতিকে সচেতন করার কাজ করতে হয়। তা ছাড়া স্যাটেলাইট ক্লিনিক, ইপিআরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের। ফলে এখন আর তাদের পক্ষে সব বাড়ি যাওয়া সম্ভব হয় না।
এ ছাড়া ঢাকা শহরে প্রচারণা কার্যক্রম দেখা না যাওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনগুলোতে সচেতনতার কার্যক্রম চালানোর দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের। কিন্তু এরপরও আমরা কাজ করছি। এখানে লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন। ঢাকা শহরে প্রায় ৭০ লাখ লোক বস্তিতে বাস করে।
অধিদফতর ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা যায়, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে কোনো নিয়োগবিধি নেই। প্রায় ২০ বছর ধরে কোনো পদোন্নতি নেই। একটি মামলার কারণে প্রায় তিন বছর ধরে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা পদে নিয়োগ নেই। নতুন ইউনিয়নগুলোতে কোনো লোকবল নেই।
এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মহাপরিচালক কাজী মোস্তফা সারোয়ার  বলেন, দম্পতি অনুযায়ী জনবল কাঠামো সংশোধনের প্রস্তাবের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কিছু হয়নি। মাঠ পর্যায়ে প্রায় ছয় হাজার পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদে দ্রুত নিয়োগ দিতে পারলে জনসচেতনতা কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল হক সকালের খবরকে বলেন, আজ থেকে ২০ বছর আগে তথ্যপ্রবাহের মাধ্যম সীমিত ছিল। বর্তমানে ইউটিউব, ফেসবুকসহ বহু মাধ্যম থেকে মানুষ তথ্য পাচ্ছে। তাই গণহারে শুধু একটি মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালালে সেটা এখন চলবে না। এখন স্থান ও জনগণের বৈশিষ্ট্য, রুচি, শিক্ষা, আয়, পেশা ইত্যাদি বিবেচনায় এনে সব মাধ্যমেই পরিবার পরিকল্পনার বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। বস্তি এলাকার জনগণের জন্য আলাদা কার্যক্রম নিতে হবে। কোন মাধ্যমটি জনগণ গ্রহণ করছে, সেটা গবেষণার মাধ্যমে জানতে হবে।  
সম্প্রতি সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে নতুন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অধিদফতরের পরিচালক মো. ফেরদৌস আলম। তিনি বলেন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জনে এখন মা ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, বাল্যবিবাহ রোধ, লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ, কিশোর-কিশোরীর প্রজনন স্বাস্থ্যের উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোতে আমরা জনসচেতনতা তৈরি করছি। এ জন্য অধিদফতর থেকে ৩২টি গাড়িতে করে ভ্রাম্যমাণ চলচ্চিত্র ইউনিট এখন ৬৪টি জেলায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। প্রতিটি ইউনিট দুটি জেলায় মাসে ১৫টি করে ৪৫ মিনিটের সচেতনতামূলক চলচ্চিত্র প্রদর্শন করছে। বিশেষ করে অজপাড়াগাঁয়ে গিয়ে সন্ধ্যার পর এ চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতারে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তা ছাড়া গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের শিক্ষকদের করা একটি জরিপ ও তাদের সুপারিশ অনুযায়ী একেক জায়গার জন্য একেক রকম সচেতনতামূলক কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে। যেমন-সিলেটের লোকেরা ধর্মভীরু হওয়ায় তাদের সচেতন করতে ইমামদের এ কাজে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছি। রাজশাহী অঞ্চলে তাদের কাছে জনপ্রিয় লোকসংগীত গম্ভীরার মাধ্যমে এ সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হবে। সচেতনতা কার্যক্রমে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের চেষ্টা করছি। ঢাকাসহ শহর এলাকার জন্য আলাদা কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে।