শুক্রবার ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮, ভোর ০৫:৫৬

পরিবেশবান্ধব জাহাজ ভাঙা শিল্প বিকশিত হোক

Published : 2017-03-22 09:44:00, Updated : 2017-04-04 20:22:38
মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ: দীর্ঘকাল ধরে চট্টগ্রামের সমুদ্র উপকূলে গড়ে ওঠা জাহাজ ভাঙা শিল্প অনিয়ন্ত্রিতভাবে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে। যার ফলে সম্ভাবনাময় এ শিল্পের আশানুরূপ বিকাশ ঘটছে না। ফলে সমুদ্র উপকূল এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকার ভয়াবহ পরিবেশ দূষণসহ বনজ সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ ও পর্যাপ্ত শ্রমিক নিরাপত্তার অভাবে বিগত দিনে জাহাজ ভাঙা শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে।

কাজ করার সময় আহত হয়েছে বহু শ্রমিক। বিভিন্ন সময়ে সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের উপকূলবর্তী এলাকায় ক্রমাগত বর্জ্য নিঃসরণের ফলে সমুদ্রের পানি ও উপকূলের প্রাকৃতিক পরিবেশ দূষণ প্রক্রিয়ার ভয়াবহতা বারবার উচ্চারিত হলেও এর প্রতিকারে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায়নি। ফলে সমুদ্রের পানি এবং বায়ু দূষণে উপকূলীয় এলাকার প্রাণী ও উদ্ভিদবৈচিত্র্যে দেখা দিয়েছে মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া। কখনও জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে নিঃসরিত অপরিচ্ছন্ন তেল ও মবিল সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে পানির রঙ কালো হয়ে গেছে। গ্যাস সিলিন্ডারের সালফার নাইট্রোজেন যৌগ উপকূলের বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে। প্রতিনিয়ত বাতাসে মিশ্রিত হচ্ছে কার্বন ডাই অক্সাইড, যা উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের অস্তিত্বের ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তা-ই নয়, পানি দূষণের ফলে সীতাকুণ্ড উপকূলবর্তী ফৌজদারহাট-ভাটিয়ারী এলাকায় বোল কোরাল, ফুটন, ডোরা বাইলা জাতীয় ২১ প্রজাতির মাছ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

বিপদাপন্ন হয়ে পড়েছে তপসী, বাটা, ভেটকি প্রভৃতি আরও ১১ প্রজাতির নানা প্রকার মাছ। মাছের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে এলাকার জেলেরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এলাকার প্রায় দুইশ’র মতো জেলে পরিবার বাধ্য হয়ে পৈতৃক পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় নিযুক্ত হতে বাধ্য হয়েছে। সীতাকুণ্ড এলাকায় মাছের অভয়ারণ্য ও প্রজনন এলাকা ধ্বংসের জন্য জাহাজ ভাঙা শিল্পকেই চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞজনরা। জাহাজ ভাঙা শিল্পের সঙ্গে জড়িত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের প্রায় ৯০টি শিপইয়ার্ডে অসংখ্য শ্রমিক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কাজ করে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তামূলক পোশাক, হেলমেট, গামবুট ও গ্লাভস ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপিত হচ্ছে না। স্বয়ংক্রিয় লোহা কাটার যন্ত্র, লোহার পাত টেনে আনার ক্রেনের মতো যন্ত্রপাতির ব্যবহার না করার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সেখানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও অপ্রতুল। বিষাক্ত গ্যাস ও বর্জ্য পরিশোধনের পর জাহাজ ভাঙা শুরু করার নিয়ম থাকলেও সব ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না।

২০০৭ সালে বেলার একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট জাহাজ ভাঙা শিল্প নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষকে দেওয়া নির্দেশ মোতাবেক বাংলাদেশের উপকূলে কোনো জাহাজ আনতে হলে তা পূর্বেই দূষণমুক্ত করে নিতে হবে। শিপইয়ার্ডগুলোতে জাহাজ ভাঙার আগে নিতে হবে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র। এমনকি বন্দরে আসা জাহাজের সংখ্যা এবং তাতে কী ধরনের বর্জ্য আছে তা সুপ্রিমকোর্টকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। বিষাক্ত বর্জ্যবাহী জাহাজ আমদানি করাও বেআইনি। জাহাজ ভাঙা শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে হাইকোর্টের একটি রুলও ইতোপূর্বে জারি হয়েছিল। এছাড়া বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের বিকাশের উদ্দেশ্যে পরিবেশ দূষণ ও সুরক্ষার শ্রমিক নিরাপত্তা ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণসহ অন্য বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত মান নিশ্চিতকরণের গুরুত্ব বিবেচনায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। সীতাকুণ্ড নিকটবর্তী সমুদ্রে মাছের অভয়ারণ্যের প্রধান উত্স ছিল উপকূলবর্তী বিশাল প্যারাবন। সীতাকুণ্ড উপকূলজুড়ে বিশাল প্যারাবনের শেকড়ে মা মাছেরা ডিম ছাড়ত। বর্তমানে সেসব প্যারাবন উজাড় করে জাহাজ ভাঙা শিল্প গড়ে ওঠায় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র যেমন নষ্ট হয়ে গেছে, তেমনি শিপইয়ার্ড নির্মাণের প্রয়োজনে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের গাছপালা। সবুজ বেষ্টনীও উজাড় হওয়ার পথে। ইতোপূর্বে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৮ সালেই চার দফায় ১২৫ একর জায়গা থেকে ৪০-৫০ হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন সংবাদ মিডিয়ার খবরে জানা যায়, প্যারাবন উজাড় করার পেছনে এক বিশেষ কারণও রয়েছে। সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি-কুমিরা উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধ বরাবর জমির যে দাম সে অনুপাতে এ জমির সামনে ২০০-৩০০ ফুট জুড়ে প্যারাবন উজাড় করা শিকস্তি জমির (যেখানে সাগরের জোয়ারের পানি উঠে আসে) মূল্য অনেকগুণ বেশি। কারণ এসব জমি লিজ নিয়েই সেখানে সহজে গড়ে তোলা হয় শিপব্রেকিং ইয়ার্ড। অনেক সময় লক্ষ করা যায়, ইউরোপের দেশগুলোতে মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজের বেশির ভাগেরই তলদেশ ফেটে গিয়ে তেল নিঃসরণ হওয়ায় তাদের সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় ব্যাপক দূষণ ঘটে। সে কারণে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ বিক্রি করে দেওয়া হয়। যুদ্ধজাহাজগুলোতে থাকে নানা ধরনের বিষাক্ত বর্জ্য। এসব জাহাজ শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে ভাঙার সময় মারাত্মকভাবে পানি ও মাটি দূষণ ঘটে থাকে। পরিবেশের ওপর ফেলে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব।

আইএমও কনভেনশন মোতাবেক যেকোনো পুরনো জাহাজ বিক্রির পূর্বে নিজ দেশের বন্দরে জাহাজ পরিষ্কার করে দেওয়ার সকল দায়িত্ব মালিকের হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয় উপেক্ষা করে সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে অনেক জাহাজ অপরিষ্কার অবস্থায় এনে সমুদ্র উপকূলে বর্জ্য ফেলে জাহাজ পরিষ্কার করার অভিযোগ উঠেছে অনেক সময়। শ্রমিকের জীবন নিরাপত্তার দিকটিও উপেক্ষিত থাকায় শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনার কারণে শ্রমিক মৃত্যু ঘটেছে। শিপব্রেকিং ইয়ার্ড নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙার কারণে যাতে সমুদ্র উপকূলের প্যারাবন, উপকূলীয় এলাকার মাটি ও পানি দূষণসহ সামগ্রিক পরিবেশ নষ্ট না হয় এবং জাহাজ ভাঙা শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের জীবন ও স্বাস্থ্যনিরাপত্তা সুরক্ষা করা যায়, এসব বিবেচনায় রেখে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। এর আওতায় প্রণীত আইন-কানুন মেনে আগামীতে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ জোন এলাকায় সকল ইয়ার্ড নির্মাণ এবং এর কার্যক্রম অব্যাহত রাখা জরুরি।

প্রণীত আইনের বিধান লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পৃথিবীর অন্যতম জাহাজ ভাঙা শিল্পের দেশ আমাদের বাংলাদেশ। এখানে লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলেই প্রায় দশ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রায় অর্ধশত শিপইয়ার্ড রয়েছে। প্রায় ৪ লাখের বেশি শ্রমিক জাহাজ শিল্পের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত। তাদের জীবন ও সেখানকার পরিবেশ নিরাপত্তার ব্যাপারে অধিক যত্নশীলতা জরুরি। রড ও লোহাজাত পণ্যের কাঁচামালের বড় উত্স এই শিপব্রেকিং। সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব আয়েরও অন্যতম উত্স এই জাহাজ ভাঙা শিল্প। কাজেই একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা মেনে শিপব্রেকিং ইয়ার্ড নির্মাণের পাশাপাশি সমুদ্র উপকূলের প্যারাবন সুরক্ষা, উপকূলীয় এলাকার মাটি ও পানি দূষণ রোধসহ সামগ্রিক পরিবেশ বিনষ্ট রোধের নিশ্চয়তা বিধান করে জাহাজ ভাঙা শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের জীবন ও স্বাস্থ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে পরিবেশবান্ধব জাহাজ ভাঙা শিল্পের বিকাশ আগামী দিনে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক সমৃদ্ধির পথে এক সুখবার্তা বয়ে নিয়ে আসবে, এটাই আজকের দিনের প্রত্যাশা। লেখক : গল্পকার