রবিবার ২১ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ০৪:৪৫

পাহাড় সুরক্ষার কৌশল বাস্তবায়ন করতে হবে

Published : 2017-07-12 22:10:00
ওসমান গনি: প্রতি বছর বর্ষাকাল এলেই আমাদের দেশে পাহাড় ধসে মানুষ মরাটা একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। তবে বছর বছর মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যেন দেখার কেউ নেই। যখন মানুষ মরে তখন কয়েকদিন খুব হইচই থাকে। অথচ যখন সমাজের রাঘববোয়ালরা পাহাড় কাটার উত্সবে মেতে উঠে তখন তারা কোথায় থাকে? পাহাড় কাটার সচিত্র সংবাদ গণমাধ্যমে প্রচার হলেও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা কোনো ব্যবস্থা নেন না। পাহাড় কাটার আগে যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো তাহলে এ ধরনের ঘটনা ঘটত না, এত লোকের জীবনও শেষ হতো না। পাহাড় নেই পাহাড়ের জায়গায়, নেই টিলা, পাহাড়ের উপত্যকাও নেই। একেকটি পাহাড়-টিলা ছয় মাস, এক বছর কি দুই বছর সময়ের ব্যবধানে ‘সমতল’ হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের কাছেও পাহাড় মানে পৃথিবীর ‘পিলারে’র গুরুত্ব। বাংলাদেশে পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ। খুব সহজ কথাটি আইনে আছে, তবে বাস্তব প্রয়োগের দেখা মিলে না। পাহাড়কে ঘিরে অহরহ চলছে দখল-বেদখলের ভয়ানক কানামাছি খেলা। অবাধে কেটে-খুঁড়ে সাবাড় করা হচ্ছে পাহাড়গুলো। এর পেছনে বরাবরই বুক ফুলিয়ে তত্পর ভূমিদস্যু চক্র। ওরা থাকে সবসময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। আর এমনিভাবেই দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত বন্দরনগরীসহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতিনিয়ত সবার চোখের সামনেই পাহাড়-টিলারাশির ধ্বংসলীলা চলছে।
পাহাড়, বন-জঙ্গল, বঙ্গোপসাগর, পাহাড়ি খরস্রোতা নদ-নদী, হ্রদ, সবুজ উপত্যকা মিলে চট্টগ্রাম অঞ্চলটি হচ্ছে প্রকৃতির সুনিপুণ হাতে গড়া অপরূপ ঠিকানা ‘প্রাচ্যের রানী’। যার অনেকটাই এখন মলিন ও লুপ্তপ্রায়। এ ধরনের বিরল ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন অঞ্চলকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘পরিবেশ-প্রতিবেশ সঙ্কটাপন্ন এলাকা (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল)’ হিসেবে সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশে সেই উদ্যোগ অনুপস্থিত। ব্রিটিশ আমলে বন্দরনগরীর কেন্দ্রস্থলে প্রতিষ্ঠিত চিটাগাং ক্লাবের উদ্যোগে পাহাড় সুরক্ষায় চা বাগান ও বন সৃজন করা হয়। নগরীর টাইগার পাস পাহাড়ের গভীর বনে তখন বাঘ দৌড়ে বেড়াত। চট্টগ্রামের এসব পাহাড়ের চিহ্ন আজ মুছে যেতে বসেছে। শুধু চট্টগ্রাম নয়; পাহাড়, টিলা, পাহাড়ের উপত্যকাসমূহ একের পর এক নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে সিলেট, মৌলভীবাজার ও কুমিল্লায়ও। আগ্রাসী ভূমিদস্যুরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছিন্নমূল নিরীহ গরিব মানুষকে ঠেলে দিয়েছে ন্যাড়া ও কেটে-খুঁড়ে দীর্ণ-বিদীর্ণ নাজুক হয়ে থাকা পাহাড়-টিলার গায়ে কিংবা পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসের মধ্যেই। বিনিময়ে ‘ভাড়া’ আর ‘চাঁদা’র নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তার ভাগ চলে যাচ্ছে অসত্ শ্রেণির কর্তা-নেতাদের পকেটেও। মাঝেমধ্যে বিশেষত বর্ষা মৌসুম এলে কোথাও কোনো পাহাড়-টিলা ধসে গিয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটলে কিছুদিন চলে হইচই, দৌড়ঝাঁপ। তারপর আবার সবকিছু জাদুর কলকাঠির জোরে ‘ম্যানেজ’ হয়ে যায়। কোনো ‘সমস্যা’ হয় না পাহাড়খেকো ভূমিদস্যুদের।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে নির্বিচারে পাহাড়-টিলারাশিকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলা হয়েছে। এর জন্য সরাসরি দায়ী অতিলোভী ও অপরিণামদর্শী একশ্রেণির মানুষের ধ্বংসের কালো হাত। কেননা, একটি পাহাড় বা টিলার স্বাভাবিক ‘ভূমিরূপ’ বা গঠনবৈশিষ্ট্য কেটে-খুঁড়ে পরিবর্তন করা হলেই সেখানে পরিবেশগত ভারসাম্য বিপন্ন হয়ে পড়ে। আর সেই ধ্বংসলীলার কারণেই ভারসাম্য হারা পাহাড় তথা প্রকৃতি তার আপন নিয়মের ধারায় উল্টো প্রতিশোধ নিচ্ছে। নির্মম হলেও পাহাড়ধস, ভূমিধস তার অন্যতম এবং স্বাভাবিক নজির। তা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্র ও বেসরকারি সংস্থার সূত্রমতে, বন্দরনগরীসহ সমগ্র বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে বর্তমানে একশ’রও বেশি পাহাড়ে অন্তত ১৮ লাখ মানুষ বিপজ্জনক অবস্থায় বসবাস করছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরীর লালখান বাজার, খুলশী, বায়েজিদ, পাহাড়তলী, জেলার হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, মিরসরাই, সীতাকুণ্ড, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, বাঁশখালী এবং কক্সবাজার শহরসহ জেলা, তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ক্ষতবিক্ষত পাহাড়-টিলার ধারে-কিনারে অগণিত মানুষ বসবাস করছে। যাদের বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের ছিন্নমূল মানুষ। তারা অধিকাংশই জানে না পাহাড়-টিলা ধ্বংস করে কৃত্রিমভাবে সমতল করা হলেও তা মনুষ্যবসতির ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, এমনকি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এতে করেই জরাজীর্ণ ও বিদীর্ণ করে দেওয়া পাহাড়ের কোলে নেমে আসছে ভয়াবহ বিপর্যয়।
পাহাড়গুলো পৃথিবীর ভারসাম্য ও স্থিতিস্থাপকতা রক্ষাকারী পিলার হিসেবে কাজ করছে। পাহাড় ধ্বংস বা নির্মূল হলে সেই ভারসাম্য বিনষ্ট হয়। পাহাড় কাটা আইনত নিষিদ্ধ। চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়গুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। এসব পাহাড় পাথুরে নয়; বরং বালুকাময় ও নরম মাটির। তাই বসবাসের ক্ষেত্রেও বিশেষত্ব রক্ষা করতে হবে। পাহাড়ের মাটির গঠন অনুযায়ী বাড়িঘর, স্থাপনা তৈরি করতে হবে। এর ভূমিরূপ ব্যাহত হয়, এমনটি করা যাবে না। পাহাড় প্রকৃতিগতভাবে সৃষ্ট। একে ধ্বংস হতে দেওয়া হলে যেভাবে পাহাড় ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটছে, পরিণতি এর চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। পাহাড়ের সাপোর্ট না থাকলে ভূমিকম্পের প্রকোপ এবং এতে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বেড়ে যাবে। তাছাড়া বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে বিভিন্নভাবে। পাহাড় বা প্রকৃতিকে ‘প্রাকৃতিক’ থাকতে না দিয়ে ধ্বংস করে দিলে সে তো প্রতিশোধ নেবেই। পাহাড়কে পাহাড়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী রক্ষা করতেই হবে। এর জন্য সকল সরকারি দফতরের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। তাছাড়া পাহাড় কেটে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসরত নিম্ন আয়ের মানুষদের বিপদ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। এর দায় আমাদের সকলের। পরিবেশ আইনে পাহাড় কাটা-ছাঁটা নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড, পাহাড় কাটলে হাতেনাতে আটক যন্ত্র-সামগ্রী জব্দ, নিষেধাজ্ঞা, পাহাড়কে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিধিবিধান রয়েছে। তবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে সীমিত ও পরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটার সুযোগ রয়েছে। আর সেই সুবাদে পাহাড়খেকো ভূমিগ্রাসীরা কাটছে পাহাড়। দেখা গেছে, কোথাও একটি পাহাড়ের কিছু অংশ কাটার অনুমতি থাকলে তাকে পুঁজি করে আরও ৮-১০টি পাহাড়-টিলা কেটে-ছেঁটে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। বিশেষত একশ্রেণির ঠিকাদার তাই করছে। পাহাড় কাটা কার্যকরভাবে বন্ধ হচ্ছে না। এর পেছনে পরিবেশ আইনের দুর্বলতা রয়েছে। চট্টগ্রামে পরিবেশ অধিদফতরের কার্যালয়টিও নির্মিত হয়েছে পাহাড়কে কেটে-খুঁড়ে। আইনের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে পাহাড় কেটে ধ্বংস করেও। পাহাড়-টিলারাশি হচ্ছে প্রকৃতির অপার দান। এগুলো দুর্যোগরোধ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে। সেই পাহাড় যখন ধ্বংস করা হয় তখন প্রাকৃতিক প্রতিশোধ নেমে আসে। আমাদের অনেক সুশোভিত পাহাড় নির্মূল করে ফেলা হয়েছে। আর যাতে ধ্বংসলীলা না হয় এর জন্য এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় দুর্যোগ-দুর্বিপাক আরও বৃদ্ধি পাবে।
আন্তর্জাতিক পাহাড় বিশেষজ্ঞরা বিপুল আগ্রহ নিয়ে আসেন বাংলাদেশের পাহাড় দেখতে। ঘুরে যান চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও রাঙামাটির পাহাড়ি এলাকা। বিশেষজ্ঞরা কর্মশালাও করেন। তারা বাংলাদেশের পাহাড় ও টিলারাশি এখানে-সেখানে কেটে-খুঁড়ে ধ্বংসের ভয়াবহ চিত্র স্বচক্ষে দেখে রীতিমতো হতবাক হয়ে যান। ভয়াবহ প্রক্রিয়ায় নয়নাভিরাম সারি সারি পাহাড় কেটে-খুঁড়ে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। পাহাড় থাকছে না আর পাহাড়ের জায়গায়। সেখানে কৃত্রিম সমতলের ওপর অপরিকল্পিত ও যথেচ্ছ বাড়িঘর তৈরি করে নিম্ন আয়ের মানুষ বসবাস করছে। কিন্তু সেসব বসতি মোটেও টেকসই বলা যাবে না। বরং বসবাসের ক্ষেত্রে এমনকি প্রাণহানির মতো ঝুঁকি সৃষ্টি করে আছে। পাহাড়-পর্বতকে পাহাড়ের মতোই ‘প্রাকৃতিক’ থাকতে দিতে হবে। ধ্বংস নয়, পাহাড়গুলোর পরিকল্পিত সুরক্ষা জরুরি। সরকারি-বেসরকারি সকল মহলকে মিলিতভাবে সেই উদ্যোগ গ্রহণে এগিয়ে আসতে হবে।
পাহাড়-পর্বত ও টিলারাশি সুরক্ষায়, এমনকি উন্নয়নে বিশ্বে অতুলনীয় এক নজির স্থাপন করেছে ‘পাহাড়-পর্বতের দেশ’ ও ‘হিমালয় কন্যা’ খ্যাত নেপাল। দেশটিতে পাহাড় রক্ষা সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়ে থাকে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল-ফসল, ক্ষেত-খামার এবং বনায়ন করা হয়েছে। যার কারণে সে জায়গার মাটি আলগা হচ্ছে না বা সরছে না। বরং মাটিক্ষয় কার্যকরভাবে রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। উত্তাপ অতিক্রম করে বৃষ্টির পানি নিচের দিকে অপসারিত হচ্ছে। সল্টের কারণে পাহাড় রক্ষার পাশাপাশি এর সুফল ভোগ করছে প্রান্তিক জনগণ তথা কৃষক। সল্টের সফল অভিজ্ঞতায় নেপালে বর্ষায় পাহাড় ধসের ঘটনা নেই বললেই চলে। পাহাড় বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালে পাহাড় সুরক্ষার কৌশল বাংলাদেশের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। এর ফলে পাহাড় ও পাহাড়ি উঁচু-নিচু ভূমি সংরক্ষণ সহজতর হবে।
লেখক : সাংবাদিক
ganipress@yahoo.com