শুক্রবার ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮, দুপুর ০১:৪০

নতুন বাজেট : সংসদীয় নিরীক্ষণ

Published : 2017-07-08 22:33:00, Updated : 2017-07-09 09:36:12
ড. অরুণ কুমার গোস্বামী: ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবে ২০০২ সাল থেকে শুল্ক চলে আসাসহ সংশ্লিষ্ট সব তথ্যের অপরিহার্য উত্স ‘বাজেট অফিস’ থাকলে সংসদ সদস্যগণ তথ্যাভিজ্ঞ আলোচনা করতে পারতেন। বলা বাহুল্য, জাতীয় সংসদের একটি ‘বাজেট অফিস’ বাজেট প্রক্রিয়ার সংসদীয় নিরীক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয়। এই আখ্যায়িকার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাভাবিক প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের বাজেট প্রক্রিয়ায় জাতীয় সংসদের নিরীক্ষণ পরিস্থিতির অবস্থা কী? গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বা সংসদীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এই প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গত ২৯ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশন শেষ হয়েছে। এবারে জাতীয় সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত ৪,০০,২৬৬ কোটি টাকার বার্ষিক বাজেট এ যাবত্কালের সর্বোচ্চ। রূপকল্প ২০২১ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জনের জন্য কাজ করছেন। উল্লেখ্য, এবারের বাজেট অধিবেশনে অযথা কোনো অশালীন মন্তব্য করা হয়নি। গত ১ জুন অর্থমন্ত্রী কর্তৃক জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপনের পর থেকে দেশব্যাপী আলোচনা-পর্যালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। এ বিষয়গুলো নিরসনের লক্ষ্যে একটি আকর্ষণীয় সংসদীয় আলোচনা এবারে লক্ষ করা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রনায়কোচিত অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ বক্তব্য দ্বারা জাতীয় সংসদ ও দেশবাসী আশ্বস্ত হয়েছেন। সংসদের বাজেট অধিবেশনের সর্বশেষ ভাষণে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘এবারের বাজেট ঘোষণার পর দেশের সর্বস্তরে এর পক্ষে-বিপক্ষে যেভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে তা আমার কাছে ইতিবাচক মনে হয়েছে। আমাদের সরকার জনগণের সরকার। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর জনগণের মতামত সঠিক পথে চলার নির্দেশনা দেয়।’ এটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের দায়িত্ববান অর্থমন্ত্রীর উপযুক্ত কথা। তবে এই বক্তব্যের দ্বারা জাতীয় সংসদের বাজেট নিরীক্ষণের পরিস্থিতি অনুধাবন করা যায় না। কারণ হিসেবে প্রথমেই লক্ষ করা যাচ্ছে, অর্থমন্ত্রী বাজেট আলোচনা-পর্যালোচনার জন্য ‘দেশের সর্বস্তরে’র প্রশংসা করেছেন। তাহলে ‘জাতীয় সংসদ কর্তৃক বাজেট প্রক্রিয়া নিরীক্ষার’ যে বিষয় তা কিন্তু অস্পষ্টই থেকে যাচ্ছে।  
সাধারণত বাজেট প্রক্রিয়ায় পার্লামেন্ট বা সংসদের ভূমিকা খুবই কঠিন। এটি মৌলিক, যেহেতু পার্লামেন্টের আসল উদ্দেশ্য হল, যে জনগণকে তারা প্রতিনিধিত্ব করেন তাদের নামে ‘কর আরোপ’ করা। ব্যয় নির্বাহ ও রাজস্বগুলো আদায়ের জন্য সরকারকে কর্তৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাই অবশ্যই যথেষ্ট পরিমাণে জেনে-শুনে-বুঝে জ্ঞানযোগ্যভাবে ‘নিরীক্ষণের’ কাজ করার লক্ষ্যে সংসদ সদস্যদের যথেষ্ট পরিমাণে ওয়াকিবহাল থাকতে হয়। তবে দুঃখজনকভাবে লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, জাতীয় সংসদের সদস্যগণ সাধারণভাবে ব্যয় খাত ও আয়ের জন্য রাজস্ব খাতের খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে খুব কম বা একেবারেই ওয়াকিবহাল নন। প্রসঙ্গক্রমে, এবারের বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রীর সমাপনী বক্তব্যে একটি অংশের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনা-সমালোচনা প্রসঙ্গে মুহিত বলেন, ‘বাজেট উপস্থাপনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সব দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় দু-চারটি শুল্ক বা করহার বৃদ্ধির প্রস্তাবাবলির ওপর। ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি ছিল একটি বিতর্কের বিষয়। অনেক সংসদ সদস্য ও গণমাধ্যম ভুলেই গিয়েছিল যে এই শুল্ক ২০০২ সাল থেকে দেওয়া হচ্ছে।’ গণমাধ্যমের ভুলে যাওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া গেলেও, যেহেতু ‘জাতীয় সংসদ কর্তৃক বাজেট প্রক্রিয়ার নিরীক্ষণ’ সম্পর্কে বলা হচ্ছে সেহেতু ২০০২ সাল থেকে ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবের ওপর শুল্ক চলে আসার তথ্য ‘ভুলে’ যাওয়ার বা বিবেচনায় না নেওয়া নিশ্চয়ই জাতীয় সংসদের শক্তিশালী ‘নিরীক্ষণ’-এর পরিচয় বহন করে না।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী মহোদয়গণ তাদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬০টি চাহিদা উপস্থাপন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যগণ ৩৫২টি ছাঁটাই প্রস্তাব (কাট মোশন) উপস্থাপন করেন। মন্ত্রীদের দাবিগুলো কণ্ঠভোটে অনুমোদিত হয়েছে। তবে ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো বাতিল হয়ে যায়। বিরোধী জাতীয় পার্টির ও স্বতন্ত্র দলীয় সংসদ সদস্যগণ মন্ত্রণালয়সমূহে বরাদ্দের নিমিত্তে অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন বিল ২০১৭-এর বিরুদ্ধে কাট মোশন বা ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করে মন্ত্রীদের কাছে বিদ্যুতের বিল না বাড়াতে অনুরোধ করেন। তারা স্কুল ও কলেজগুলোর জন্য মাসিক পে-অর্ডার সিস্টেম বরাদ্দের এবং উন্নত জনস্বাস্থ্য সেবা চালু করার দাবি করেন। জাপা এমপি কাজী ফিরোজ রশীদ, নুরুল ইসলাম ওমর, নুরুল ইসলাম মিলন, ফখরুল ইমাম এবং রওশন আরা মান্নান এবং স্বতন্ত্র সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী খাদ্য, স্বাস্থ্য, অর্থ, শিক্ষা, সড়ক পরিবহন এবং সেতু, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত বরাদ্দের বিরুদ্ধে কাট মোশনগুলো উত্থাপন করেন। নুরুল ইসলাম মিলন বলেন, পারিবারিকভাবে সম্পর্কিত ডিরেক্টরগণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। ব্যাংকিং সেক্টরের অবস্থা খুবই নাজুক মন্তব্য করে তিনি অভিযোগ করেন, ‘ডিরেক্টররা এক লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়েছেন এবং এখন তারা ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছেন।’ রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, ‘ডিরেক্টরদের আত্মীয়স্বজন শুধু ঋণই নেননি, তারা বিদেশেও টাকা পাচার করছেন।’ ব্যাংকিং সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি একটি ব্যাংক কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেন। কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘সরকারি ব্যাংক লুট হয়েছে। এখন ডিরেক্টরদের পরিবারের সদস্যরা প্রাইভেট ব্যাংকও লুট করছেন।’ তিনি প্রস্তাব করেন যে কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ডিরেক্টর স্বতন্ত্র হওয়া উচিত।
সংসদ সদস্যদের সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত বলেন, ‘প্রতিটি ব্যাংকের স্বতন্ত্র ডিরেক্টর আছে এবং এখন সংসদে একটি বিল প্রক্রিয়াধীন আছে, যেখানে কমপক্ষে চারজন স্বতন্ত্র ডিরেক্টর রাখার কথা বলা হয়েছে। অনেকেই বলছেন কোনো কারণ ছাড়াই ব্যাংকগুলোকে সাবসিডি দেওয়া হচ্ছে, এটি ঠিক নয়। ব্যাংকিং সেক্টর খুবই স্পর্শকাতর একটি বিষয়, যদি একটি ব্যাংকে কোনো দুর্যোগ নেমে আসে তাহলে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া সব জায়গাতেই পড়ে। সুতরাং আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার ব্যাংকিং সেক্টর এবং অর্থবাজারে সুশাসন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।’ সঞ্চয়পত্রের সুদের হার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মূলত ব্যাংক ব্যবস্থায় সুদের হার কমার কারণে সঞ্চয়পত্রের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সঞ্চয়পত্র হতে অধিক ঋণ গ্রহণ করতে কোনো পেনশনভোগী, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত যাতে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।’
সংসদ সদস্যগণ স্কুল এবং মাদ্রাসাগুলোতে মাসিক পে-অর্ডার, শিক্ষার গুণগত মান ফিরিয়ে আনার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ এবং শিশুদের ওপর বোঝা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা বাতিল করার দাবি জানান। এর উত্তরে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘মাসিক পে-অর্ডারের বিষয়টি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে অর্থ প্রতিমন্ত্রীকে প্রধান করে গঠিত একটি কমিটি কাজ করছে। আমি আশা করি যে প্রণীত নির্দেশনার ভিত্তিতে চূড়ান্তকৃত এমপিওর জন্য অর্থমন্ত্রী অর্থ বরাদ্দ করবেন।’ সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মিলন সতর্ক করে বলেন, ‘বিদ্যুতের অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি জনসাধারণকে নিঃশেষ করে দেবে।’ রওশন আরা মান্নান বলেন, ‘বিদ্যুত্ খাতে বিদ্যমান দুর্নীতি এই খাতের সফলতাকে ম্লান করে দিচ্ছে।’
খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘চালের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হচ্ছে। কৃত্রিম সঙ্কট আজকের পরিস্থিতির জন্য দায়ী। আমাদের কোনো সঙ্কট নেই। আমাদের যথেষ্ট মজুদ আছে। চাল আমদানির ওপর ডিউটি কমানোর কারণে আর কোনো সমস্যা সৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।’
পার্লামেন্টকে অবশ্যই সরকারের কর্মকাণ্ডকে তত্ত্বাবধান করতে হবে কিন্তু তা করতে হবে দায়িত্বের সঙ্গে। দীর্ঘকাল যাবত্ পটভূমিতে থাকার পর বাজেট প্রক্রিয়ায় পার্লামেন্টের ভূমিকা এখন উল্লেখযোগ্য জনদৃষ্টি আকর্ষণ করছে। সংসদীয় ব্যবস্থায় আইনসভার প্রথম মিশন হচ্ছে সরকারকে সমর্থন করা। ক্ষমতাসীন সরকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর মধ্যে অব্যাহতভাবে ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য বজায় রাখতে হবে। একটি সংসদীয় ব্যবস্থাকে যথাযথভাবে কাজ করার জন্য এটি অপরিহার্য। তবে এটি নির্দিষ্টভাবে বাজেটীয় নিরীক্ষণকে কঠিন করে দেয়, কারণ যাকে আমরা সমর্থন করি তাকে কি আসলেই নিরীক্ষণ করতে পারি? এটি সত্যি, এমনকি একটি দলীয় চেতনা ছাড়াও ক্রিয়াশীল সংসদীয় ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত এই বিরোধিতা, রাজনৈতিক দলীয় অন্তর্ভুক্তি নির্বিশেষে সরকারি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের জন্য সঠিক।  
ফরাসি সিনেটের প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিয়ান পোঞ্চেলেট বাজেটীয় সতর্ক পর্যবেক্ষণকে দেখেন বাজেটের নিয়মানুবর্তিতা অপেক্ষা কম সতর্ক পর্যবেক্ষণ এবং এর উপযুক্ততার চেয়ে; অর্থাত্ বাজেটীয় সম্পদসমূহ সরকারের কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তার যাচাই হিসেবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দ্রুত সাড়া এবং অগ্রসর-দৃষ্টিসম্পন্ন সরকারি নীতি প্রভৃতি গভর্ন্যান্স ইস্যুর সংলাপ হতে এটি দ্রুত স্পষ্ট হয়ে আসছে যে সংসদ হচ্ছে সার্বিক চিত্রটির একটি মৌলিক অংশ। সামঞ্জস্যপূর্ণ সরকারি নীতি এবং আইন প্রণয়নসহ উত্তম-তথ্যাভিজ্ঞ এবং উপযুক্ত আইনসভা, নির্বাহী বিভাগের নীতিমালা ও কর্মকাণ্ডের ওপর বৈধ গণতান্ত্রিক নিবৃত্তির সংস্থান করে। এ সময়ে পার্লামেন্ট তাদের কাজে বিরাট পরিবর্তন আনছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সংসদীয় নিরীক্ষণ। সেহেতু বাজেট প্রক্রিয়ার একটি নিবিড় আগ্রহের বিষয় হচ্ছে সংসদীয় নিরীক্ষণ।
সময় অতিক্রম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজেট অধিবেশনের সঙ্গে নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে। তবে ‘করারোপ’ এবং ‘বাজেট ভারসাম্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে ঐকমত্য’ এই দুটি বিষয়ের সঙ্গে সংসদের আসল কর্মকাণ্ড মোটামুটিভাবে সম্পর্কযুক্ত। আর তাই বার্ষিক বাজেটের মুহূর্তগুলো সংসদের বাত্সরিক এজেন্ডার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে, সংসদের প্রতিনিধিত্বমূলক কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পাশাপাশি বাজেট প্রক্রিয়া মোটামুটিভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূলগত দিক দিয়ে বাজেট হচ্ছে সরকার কর্তৃক আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত নীতিমালা বাস্তবায়নের ওপর সংসদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি বৈশিষ্ট্যসূচক হাতিয়ার। সময় অতিক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজেট নীতিমালা দ্বারা অনুসৃত কার্যাবলিতে বিচিত্র বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়েছে। সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অগ্রাধিকার যখন ঘাটতি কমিয়ে আনা, তখন সংসদীয় নীতিমালা অনুসারে বাজেট, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও নীতি-নির্দিষ্টকরণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দ্রুত সাড়া এবং অগ্রসর-দৃষ্টিসম্পন্ন সরকারি নীতি প্রভৃতি গভর্ন্যান্স ইস্যুর সংলাপ হতে এটি দ্রুত স্পষ্ট হয়ে আসছে যে সংসদ হচ্ছে সার্বিক চিত্রটির একটি মৌলিক অংশ। সামঞ্জস্যপূর্ণ সরকারি নীতি এবং আইন প্রণয়নসহ উত্তম-তথ্যাভিজ্ঞ এবং উপযুক্ত আইনসভা নির্বাহী বিভাগের নীতিমালা ও কর্মকাণ্ডের ওপর বৈধ গণতান্ত্রিক নিবৃত্তি ব্যবস্থার সংস্থান করে। এ সময়ে পার্লামেন্ট তাদের কাজে বিরাট পরিবর্তন আনছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সংসদীয় নিরীক্ষণ। সেহেতু বাজেট প্রক্রিয়ার একটি নিবিড় আগ্রহের বিষয় হচ্ছে সংসদীয় নিরীক্ষণ। সময় অতিক্রম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজেট অধিবেশনের সঙ্গে নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে। তবে ‘করারোপ’ এবং ‘বাজেট ভারসাম্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে ঐকমত্য’ এই দুটি বিষয়ের সঙ্গে সংসদের আসল কর্মকাণ্ড মোটামুটিভাবে সম্পর্কযুক্ত। আর তাই বার্ষিক বাজেটের মুহূর্তগুলো সংসদের বার্ষিক এজেন্ডার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে সংসদের প্রতিনিধিত্বমূলক কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পাশাপাশি বাজেট প্রক্রিয়া মোটামুটিভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূলগত দিক দিয়ে বাজেট হচ্ছে সরকার কর্তৃক আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত নীতিমালা বাস্তবায়নের ওপর সংসদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি বৈশিষ্ট্যসূচক হাতিয়ার। সময় অতিক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, বাজেট নীতিমালা দ্বারা অনুসৃত কার্যাবলিতে বিচিত্র বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়েছে। সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অগ্রাধিকার যখন ঘাটতি কমিয়ে আনা, তখন সংসদীয় নীতিমালা অনুসারে বাজেট, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও নীতি-নির্দিষ্টকরণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী তার সমাপনী ভাষণে বলেন, ‘বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে মতামতও করা হয়েছে। এছাড়া রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বিষয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছেন। আমি এসব আলোচনা-সমালোচনাকে সবসময়ই স্বাগত জানাই। আমাদের বাজেট কিছুটা উচ্চাভিলাষী হবে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে বিগত ২০০৮-০৯ অর্থবছর হতে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত প্রত্যেকটি বাজেটের বাস্তবায়ন রেকর্ড প্রমাণ করে ‘বাজেট উচ্চাভিলাষী কিন্তু কল্পনাবিলাসী নয়।’ এই সময়ে প্রাক্কলিত বাজেটের তুলনায় গড় বাস্তবায়নের বার্ষিক হার হয়েছে ৮৮.৮ শতাংশ।
বাজেট প্রতিটি নাগরিককে প্রভাবিত করে, তাই এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অভিব্যক্তি। জোসেফ হোয়াইট (২০১৫)-এর মতে, বাজেটকে নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি হিসেবে অথবা অধিকতর উত্তমরূপে রাজনীতির মাধ্যমে নাগরিকদের মধ্যে সমঝোতা হিসেবে দেখা যেতে পারে। একটি আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক দলিল হিসেবে বাজেট হচ্ছে প্রাথমিকভাবে রাজস্ব সংগ্রহ এবং বিভিন্ন খাতের মধ্যে সরকারি সম্পদের (একটি ন্যায়সঙ্গত) বণ্টন। আর্থিক পরিকল্পনা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতিফলনসম্পন্ন সরকারের অগ্রাধিকার এবং লক্ষ্যসমূহের স্পষ্টতম প্রকাশ হচ্ছে বাজেট। এছাড়া বাজেট একটি প্রাথমিক দলিল, যার মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নকে প্রভাবিত করতে পারেন।
এজন্য জাতীয় সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরকে অবশ্যই বাজেটীয় বিষয়গুলোতে বিতর্ক এবং তাদের মতামত ব্যক্ত করতে হবে। জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নে বাজেট প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যদের ফলপ্রসূ অংশগ্রহণ ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারে, যা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক শাসনের জন্য অপরিহার্য। দৃশ্যত, এক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ এবং সংসদ সদস্যদের মধ্যে ‘ধারণাগত’ ব্যবধান আছে। বাজেট সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য সংবলিত দলিলপত্রাদিতে সংসদ সদস্যদের এক্সেস থাকলে তা তাদেরকে বাজেটীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সুচিন্তিত মতামত জোগান দিতে পারে। এজন্য এমন একটি সংস্থা প্রয়োজন, যা নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত থেকে সকল সংসদ সদস্যকে, বিশেষত বেসরকারি সংসদ সদস্যদেরকে ‘মূল্য, আর্থিক বিশ্লেষণ এবং গবেষণাসহ’ বাজেট সম্পর্কে যাবতীয় হালনাগাদ তথ্য ও উপাত্তের জোগান দিতে পারে। বাজেট প্রক্রিয়ায় সংসদীয় নিরীক্ষণের জন্য জাতীয় সংসদের একটি ‘বাজেট অফিস’ সংসদ সদস্য ও সংসদীয় কমিটিগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও বিদ্যমান জ্ঞান সরবরাহ করতে পারে।
লেখক : চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়