রবিবার ২১ জানুয়ারি, ২০১৮, সন্ধ্যা ০৬:২১

চিকুনগুনিয়ার মোটা কামড়

Published : 2017-07-05 21:59:00
মাহফুজুর রহমান: চিকন আলী ঈষত্ পরিবর্তন হয়ে আবার বুঝি ফিরে এসেছে! সে ছিল বাংলাদেশের প্রথম শাস্তিপ্রাপ্ত রাজাকার। দালাল আইনে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।
শারীরিকভাবে যারা চিকন অর্থাত্ স্লিম, আঞ্চলিকভাবে যাদের ‘চিকুন’ বলা হয়। তাদের সুবিধা অনেক। ফাঁক-ফোকর গলিয়ে যেখানে ইচ্ছে ঢুকে পড়তে পারেন। চিকন আলীও মরে ভূত হয়ে আবার দেশে ঢুকে পড়েছে। শোনা যায়, সুদূর আফ্রিকায় নাকি চিকুনগুনিয়া নামের একটি জ্বর চালু ছিল। রাজাকার চিকন আলী সেই চিকুনগুনিয়ার সঙ্গে মিশে আবার চলে এসেছে। মশককুলের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়েছে। মানুষের শরীরে কোনো মশা হুল ফোটালেই চিকন আলী ভেতরে ঢুকে পড়ছে। আর তারপরই শুরু হচ্ছে দুর্বিষহ তাণ্ডব।
ঢাকা এখন চিকন আলীর দখলে। হাজারো মানুষ এই চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে নতুন অভিজ্ঞতা ভোগ করছেন। যারা আফ্রিকা বেড়াতে যেতে পারেননি তারাও ঢাকায় বসে ছোট একটি মশার কামড় খেয়ে আফ্রিকার এই রোগটির স্বাদ নিতে পারছেন। ঢাকায় যখন প্রথম এই চিকুনগুনিয়া শুরু হল তখন কারা যেন পত্রিকায় জানিয়ে দিল যে এটি অতি সাধারণ একটি জ্বর। শরীর একটু বেশি গরম হয়ে উঠলেও এটি প্রাণ হরণকারী নয়। শরীরে একটু ব্যথা হয় বটে, তবে এই ব্যথা জীবননাশ করে না। আর সবচেয়ে ভালো খবর হল, এই জ্বর হলে কোনো দামি ওষুধ খেতে হয় না। ‘আপা’র সঙ্গে নাম মিলিয়ে রাখা নামের একটা বড়ি খেলেই জ্বর কমে যায়।
গুনে গুনে চার দিনের এই জ্বর নিয়ে ঢাকায় হুলস্থুল শুরু হয়ে গেল। আজ এর জ্বর তো কাল ওর। সবাই ১০৪ থেকে ১০৫ ডিগ্রি তাপ নিয়ে দিন গুনতে শুরু করলেন। চার দিন, তিন দিন, দুই দিন, এক দিন, বাইশ ঘণ্টা ইত্যাদি। জ্বর থামল। এবার শুরু হল ব্যথা। অসহ্য যন্ত্রণা। গিরায় গিরায় প্রচণ্ড ব্যথা। মাথা ব্যথা। শরীর দুর্বল। হাঁটতে গেলে পা চলে না। দুর্জনেরা বলছেন, দু’চারজন নাকি মারাও গেছেন।
সরকারি পর্যায়ের কোনো বড় কর্মকর্তা চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন কি না সে তথ্য জনগণ জানে না। তবে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নাকি এই জ্বরে ভুগেছেন। অবশ্য শিক্ষা বিভাগ যে চিকুনগুনিয়ায় আগেই আক্রান্ত হয়েছে সেটা তো পরীক্ষার প্রশ্ন আউট হয়ে যাওয়ার মহৌত্সব দেখেই বোঝা যায়।
চিকন আলীর অপতত্পরতা দেখে এই মুহূর্তে সরকারও নড়েচড়ে বসেছেন। সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিয়ে একটি ‘চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র’ খোলা হয়েছে বলে জানা গেছে। এরা সরকারি ভাষায় খুব সাবধানী উচ্চারণ বাজারজাত করেছেন। এরা ‘গুনিয়া গুনিয়া’ বলছেন, এর মধ্যে শ’ পাঁচেক মানুষ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। এই রোগের প্রাদুর্ভাব আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাকবে। তবে যারা ঢাকার বাইরে থাকেন তাদের কোনো ভয় নেই। চলতি বছর চিকুনগুনিয়া ঢাকার বাইরে যাবে না। ঢাকার ভেতরেই অবরুদ্ধ থাকবে।
সরকারি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য জেনে আমরা খুবই আনন্দিত হয়েছি। প্রথমত যদি আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা সঠিক হয়ে থাকে। কিন্তু চারদিকে অনেক মানুষ যখন দাবি করেন যে তারা এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, এবং তারা যখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন তখন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের কথাটি মিথ্যে বলেই মনে হয়। আবার চিকুনগুনিয়াবাহী মশক কাউকে কামড় দেওয়ার আগে তাদের আবাসিক ঠিকানা সংগ্রহ করে নেবে, এমন নমুনাও তো দেখা যাচ্ছে না। আবার ঢাকার বাইরে যারা বসবাস করেন তারা ঢাকায় প্রবেশের ক্ষেত্রে মশক নিধন ওষুধ গায়ে মেখে ঢাকা আসবেন, এমন কোনো সংবাদ দেখিনি। ঢাকা থেকে যে সমস্ত গাড়ি মফস্বলে যায় সেগুলোতে চড়ে কোনো ঢাকাইয়া মশক মফস্বলে যেতে পারবে না, এমন ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। তাহলে সরকারি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, যা বলেছে তা হচ্ছে হাওয়াই বুলি।
ঢাকায় দুটো পৌর করপোরেশন মশক নিধন করে থাকে। এ বছর চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ ভয়াবহ হওয়ার পর বিকেলের দিকে কোথাও কোথাও ‘ভোম ভোম’ শব্দ করে পৌরকর্মীদের ধোঁয়া উড়াতে দেখা যায়। এসব ধোঁয়ার সঙ্গে মশককুল বেশ মজা করেই খেলাধুলা করে। এই ধোঁয়া নাকি ওদের নেশাগ্রস্ত করে তোলে। নেশাগ্রস্ত প্রাণীর খিদে ভালো হয়, এ খবর কে না জানে! পৌর ধোঁয়ার কল্যাণে নেশাগ্রস্ত হয়ে মশারা ঢুকে পড়ে বাড়ির ভেতরে রক্তপানের নেশায়। আর নতুন নতুন মানুষ পড়ে যান চিকন আলীর খপ্পরে। করপোরেশনের এসব ওষুধে মশা না মরে উল্টো রক্ত খাওয়ার জন্য নেশাগ্রস্ত হচ্ছে কেন, সেটাও দেখা দরকার।
এবার আসা যাক চিকিত্সা প্রসঙ্গে। যারা চিকুনগুনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে হাড়ের জোড়ায় জোড়ায় প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাদের চিকিত্সার ব্যাপার নিয়ে কী হচ্ছে? এসব রোগী ব্যথায় অধিক কাতর হয়ে যাচ্ছেন ডাক্তার সাহেবদের কাছে। তারা প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় নানা পরীক্ষা করিয়ে দুই ধরনের ওষুধ লিখে দিচ্ছেন। এর একটি হল দুটো করে প্যারাসিটামল, দিনে চারবার। আরেকটি হল পেইনকিলার বড়ি, রোজ দুটো। এর দুটোই অতিরিক্ত গ্রহণ করলে কিডনি ও লিভার নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আবার এ ওষুধগুলো খেলে রোগ নিরাময় হয় না, সাময়িক উপশম হয় মাত্র। সুতরাং স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে, ডাক্তারগণ এভাবে চিকিত্সাকাজ চালিয়ে গেলে আগামী দিনগুলোতে দেশে কিডনি ও লিভারের রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে। মানুষ আরও বিপদে পড়বে।
সরকার হয়তো তখন ‘কিডনি ও লিভার ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র’ খুলে রোগীর সংখ্যা ঘোষণা করবেন। কিন্তু জনগণ এবারের মতোই বিপদে পড়বে। তাই এর প্রকৃত চিকিত্সা কী হওয়া উচিত, এটি প্রকাশ্যে ঘোষণা করা উচিত।
লেখক : রম্যলেখক, কথাসাহিত্যিক