মঙ্গলবার ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ০২:২৬

বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে হবে

Published : 2017-07-04 22:10:00
দিলীপ কুমার আগরওয়ালা: দেশের সিলেট ও রংপুর বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা হানা দিয়েছে। ইতোমধ্যে তা লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগের কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিলেট বিভাগের বন্যাকে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবেও তুলনা করা যায়। হাওর এলাকার আগাম বন্যা সিলেট বিভাগের লাখ লাখ মানুষের সারা বছরের খোরাক যেমন কেড়ে নিয়েছে, তেমনি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর আঘাত হেনেছে নিষ্ঠুরভাবে। বিদেশ থেকে লাখ লাখ টন চাল আমদানির কঠিন বাস্তবতার মুখে ঠেলে দিয়েছে বাংলাদেশকে। হাওরের আগাম বন্যার পর হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া এবং সিলেট ও মৌলভীবাজারের নিম্নাঞ্চল ডুবে যাওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা থাবা বিস্তার করেছে মাসখানেক আগে থেকে। ভারি বৃষ্টিপাতে অবস্থা এমনই নাকাল করেছে যে মণিপুর রাজ্যের রাজধানী ইস্ফলের রাজপথে নৌকা চলাচল করছে। ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের জন্যও বিপদ ডেকে আনবে উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল।
এমনিতেই হাওর এলাকার লাখ লাখ মানুষ আগাম বন্যায় সারা বছরের খোরাকি হারানোয় তারা সরকারি ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বন্যার করাল গ্রাস অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির যে আরও অবনতি হবে তা সহজে অনুমেয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা অববাহিকাও বন্যার হুমকির মুখে। তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে কয়েক দিন আগেই। লালমনিরহাটে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বিপুল এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে ভাটির এই দেশে বন্যা নতুন কিছু নয়। এ বছর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যেহেতু বেশি, সেহেতু সে আঘাতের পরিসর বড় হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। স্বভাবতই বন্যা পরিস্থিতির মোকাবেলায় সরকারকে সময় থাকতেই প্রস্তুতি নিতে হবে। বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি থাকতে হবে। পাশাপাশি সাংবার্ষিক বন্যার কবল থেকে জানমাল বিশেষত ফসল রক্ষায় কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যায় সে বিষয়টিও প্রাসঙ্গিকতার দাবিদার। সমস্যা মোকাবেলায় নদ-নদী খনন করে নদীর পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সেটি সম্ভব হলে সারা বছর নদ-নদীতে যেমন নাব্যতা বজায় থাকবে, তেমনি বন্যার আশঙ্কা অনেকাংশে রোধ করা যাবে।
দুর্গত এলাকায় স্বাভাবিকভাবেই বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে গেছে শত শত একর ফসলি জমি। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় অনেক এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়ায় অনেক এলাকায় শ্রমিকদের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই এসব অতি দরিদ্র শ্রেণির মানুষের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। দুর্গত কয়েকটি এলাকায় সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় এই ত্রাণ নিতান্তই অপ্রতুল। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বন্যা আমাদের দেশে নতুন নয়। বিশেষজ্ঞের মতে, আঞ্চলিক ও স্থানীয় অতিবৃষ্টি এবং ভৌত অনেক কারণ বাংলাদেশে বন্যা হওয়ার জন্য দায়ী। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বন উজাড়করণ এই প্রক্রিয়ায় বেশ খানিকটা প্রভাবকের ভূমিকা পালন করছে বলে গবেষকরা প্রায় নিশ্চিতভাবে সাক্ষ্য উপস্থাপন করেছেন।
বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, ভাঙন রোধে বালির বস্তা ফেলা থেকে শুরু করে নানাভাবেই বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু অভিযোগ আছে এসব কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির। ফলে প্রতি বছরই বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নদীগর্ভে হারিয়ে যায় ফসলের মাঠ, ঘরবাড়ি, জমিজমা। সব হারিয়ে নিঃস্ব হয় অনেক মানুষ।
এ অবস্থা উত্তরণে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ যেমন নিতে হবে, তেমনি বন্যার তাত্ক্ষণিক আঘাত থেকে বাঁচার জন্য বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। দুর্গত মানুষ-পশুপাখি যেন আশ্রয় পায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে বন্যার্তদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে তা অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের জোর দৃষ্টি প্রয়োজন। সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক : পরিচালক, এফবিসিসিআই