সোমবার ২২ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ১২:৩৩

মানহীন ওষুধ নিয়ন্ত্রণ

Published : 2017-02-23 00:23:00

শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ : মানসম্মত ওষুধ উত্পাদনে ব্যর্থ ২০টি কোম্পানির সব ধরনের ওষুধ এবং ১৪টি কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক উত্পাদনে নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছেন দেশের উচ্চ আদালত। বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি মো. আতাউর রহমান খানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ সংক্রান্ত রুল যথাযথ ঘোষণা করে সম্প্রতি তাত্পর্যপূর্ণ রায় দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট ওষুধ কোম্পানিগুলো ওষুধ তৈরি বা বিক্রি করছে কি না এবং কোম্পানিগুলোর পরিস্থিতি তদারকি করে তিন মাস পরপর ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালককে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি চলমান তদারকিতে রাখার কথাও বলেছেন আদালত।

মানুষ সুস্থ হওয়ার জন্য ওষুধ ব্যবহার করে। কিন্তু সে ওষুধ যদি মানহীন হয় তবে সুস্থতার বিষয়টি অনিশ্চিতই শুধু নয়, জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সংসদীয় কমিটি মানহীন ওষুধ তৈরির জন্য ৩৪টি ওষুধ কোম্পানিকে চিহ্নিত করে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করা সত্ত্বেও তারা নানা কৌশলে সে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলছিল। উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে তাদের সে অপকৌশলে লাগাম টানা হয়েছে। দেশের মানুষের জীবন সুরক্ষার পক্ষে আদালতের রায়টি শুধু রিট আবেদনকারীই নয়, ১৬ কোটি মানুষের জন্য ‘সুবিচার’ নিশ্চিত করেছে। আদালতের এ রায় ওষুধ উত্পাদনের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করবে, আমরা এমনটিই দেখতে চাই। মানহীন ওষুধ উত্পাদনের জন্য ৩৪টি কারখানাকে চিহ্নিত করা হলেও এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক বেশি। আমরা আশা করব, মানহীন ওষুধ তৈরির সঙ্গে জড়িত সবার ক্ষেত্রেই ওষুধ প্রশাসন কঠোর হওয়ার সক্ষমতা দেখাবে। ওষুধ কোম্পানির বদলে ওষুধ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা যে দেশবাসীর ট্যাক্সের টাকায় বেতন-ভাতা পান তাদের স্বার্থ রক্ষায় যত্নবান হবেন, এমনটিই কাম্য।   
আদালতের পাশাপাশি সংসদীয় কমিটিও এ ব্যাপারে চোখ-কান খোলা রাখবে, তা দেশবাসীর প্রত্যাশিত। জীবন রক্ষায় ব্যবহূত হয় ওষুধ। আশার কথা, বাংলাদেশেই এখন মানসম্মত ওষুধ তৈরি হচ্ছে এবং এ দেশের ওষুধ ইউরোপ-আমেরিকায়ও রফতানি হচ্ছে। তবে হতাশার দিকও কম নয়। মানহীন ওষুধও এ দেশে অহরহ তৈরি হচ্ছে। প্রতারিত হচ্ছেন ব্যবহারকারীরা। ওষুধের দাম নিয়েও চলছে যাচ্ছেতাই। যখন-তখন দাম বাড়ানো উত্পাদকদের মজ্জাগত অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ওষুধে বাজার সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। ওষুধ বিপণনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে চলছে যাচ্ছেতাই অবস্থা।

বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন এবং বিশেষত আরোগ্যের প্রয়োজন কিংবা আইন দ্বারা নির্দিষ্ট অন্যবিধ প্রয়োজন ব্যতীত মদ্য ও অন্যান্য মাদক পানীয় এবং স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’     
   
বাংলাদেশে ওষুধের ট্রায়াল নিয়ে বিরাজ করছে বিপজ্জনক বিশৃঙ্খলা। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী কোনো ওষুধ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার আগে কার্যকারিতা পরীক্ষায় পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে ওষুধ বাজারজাতকরণের আগে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দেওয়া হয় না। ৯০০টি প্রতিষ্ঠান ২২ হাজার ব্র্যান্ড নাম ব্যবহার করে প্রায় ১ হাজার ২০০টি জেনেটিক ওষুধ বাজারজাত করছে। সাতটি উন্নত দেশে চালু রয়েছে, এমন প্রমাণ দেখাতে পারলে ওষুধ বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন খুব সহজেই পাওয়া যায়। কখনও ব্যত্যয় ঘটলে কেবল সে ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের কাগজপত্র হাজির করা হয়। এ ব্যাপারে সরকারের যে নজরদারি থাকা উচিত তা তার অস্তিত্বে খুঁজে পাওয়া ভার। 

ফলে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের নামে কার্যত প্রহসনের আয়োজন হচ্ছে কি না সে ব্যাপারেও সংশয় রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের ব্যাপক অগ্রগতি ঘটলেও ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে যতটা কড়াকড়ি থাকা উচিত সে ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। দেশে যেমন মানসম্মত ওষুধ উত্পাদিত হচ্ছে তেমন নকল, ভেজালের পরিমাণও কম নয়। আমি মনে করি, ওষুধ উত্পাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে সরকারকে আরও বেশি নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো হেরফের বাঞ্ছনীয় নয়। প্রতিটি ওষুধ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার আগে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী যাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা সরকারের কর্তব্য বলে বিবেচিত হওয়া উচিত।

লেখক : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট