শনিবার ২০ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ০৮:৫২

ভাষা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত চেতনা

Published : 2017-02-23 00:21:00

অরুণ কুমার গোস্বামী : ভাষা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত বহুত্ববাদী অসাম্প্রদায়িক চেতনা কি স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে বিলীন হতে যাচ্ছে? বলা বাহুল্য, এই মহান আন্দোলনটির অন্তর্নিহিত ‘বহুত্ববাদী অসাম্প্রদায়িকতার’ চেতনা এবং এগুলোর চ্যালেঞ্জ অনুসন্ধান প্রচেষ্টা যুগ যুগ ধরে চলতেই থাকবে। প্রাপ্য সব দলিল-দস্তাবেজের সাহায্যে অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটির ‘চেতনা’ সম্পর্কে একটি পাণ্ডিত্যপূর্ণ বোঝাপড়া তৈরি করা ইতিহাসবিদদের অন্যতম একটি দায়িত্ব। এ ব্যাপারে উইলিয়াম এপ্পলম্যান উইলিয়ামসের দ্য কনট্যুরস অব আমেরিকান হিস্টরি শীর্ষক গবেষণাগ্রন্থের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। উইলিয়াম এপ্পলম্যান উইলিয়ামস বলেছেন, ‘শিখনের একটি উপায় হচ্ছে ইতিহাস ...। বর্তমানকালে অবস্থান করে পেছনের দিকে লক্ষ করা ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা নয়। বরং এটি পেছনে অতীতের দিকে ফিরে যাওয়া এবং আমাদের ভূতপূর্ব দৃষ্টিকোণের ব্যাপারে বিস্তৃততর এবং অধিকতর নিবিড় সচেতনতার সঙ্গে বর্তমানে ফিরে আসা। আমরা বিদ্যমান বিকল্পসমূহ সম্পর্কে বিস্তৃততর সতর্কতা এবং উপলব্ধির তীক্ষতর সংযুক্ততা দ্বারা পছন্দগুলোকে তৈরি করতে ফিরে আসি। এভাবে অতীতের মৃত হাতের নিয়ন্ত্রক বলয়কে ঢিলা করা এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য জীবন্ত একটি হাতিয়ারে রূপান্তর ঘটানো সম্ভব হয়।’

ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন বাংলাদেশ। লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স প্রায় পাঁচ দশক। প্রায় পঞ্চাশে উপনীত বাংলাদেশে এখন লক্ষ করা যাচ্ছে, ভাষা আন্দোলনের অসাম্প্রদায়িক বহুত্ববাদী চেতনা এদেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে। এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের বক্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সিরডাপ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমার নিজস্ব একটি উপলব্ধি আছে-আমাদের এখানে সম্পূর্ণভাবে সাম্প্রদায়িকীকরণের একটি প্রয়াস বাস্তবায়িত হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে এবং এখন মনে হয় আমরা বড় ধরনের একটি বিপদের মধ্যে প্রবেশ করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সব ব্যাপারেই পজিটিভ। তিনি নির্দেশ দেন ঠিকই কিন্তু বাস্তবায়ন হওয়ার ক্ষেত্রে পাল্টে যায়।’ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ সম্পন্ন করার পদক্ষেপ, সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির অন্যতম একটি উত্স শত্রু সম্পত্তি আইন বাতিল, ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের চিন্তা এবং অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার পদক্ষেপের ঘোষণা প্রভৃতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পজিটিভ হওয়ার পরিচায়ক। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, পাকিস্তানের আইএসআই-এর পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানি লেখক জুনাইদ আহমদের লেখা ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ : মিথস এক্সপ্লোডেড বইতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার কারণে বাংলাদেশে তা নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের মাটিতে বসে লেখা এই বই বাংলাদেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলেও বাংলাদেশের ভেতরে অবস্থানকারীদের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারটি খুবই বিপজ্জনক মাত্রায় উপনীত হয়েছে এবং তা প্রতিহত করা খুবই জটিল! এ প্রসঙ্গে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে বিবর্ণ, বিকৃত করা হয়েছে, নানাভাবে নানা কৌশলে তরুণদের বিমুখ করা হয়েছে তাতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি তরুণদের আগ্রহ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে।

’ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাওয়া এবং অন্যদিকে অসাম্প্রদায়িক বহুত্ববাদী চেতনার বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে অশনিসঙ্কেত। এই সঙ্গে ধর্মীয় ঔপনিবেশিক ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার ষড়যন্ত্র সবকিছু মিলিয়ে ভাষা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত চেতনা নানাবিধ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি!
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে একদিকে স্বাধীন বাংলাদেশকে পাকিস্তানিকরণের ষড়যন্ত্র এবং অন্যদিকে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই কর্তৃক ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং একাত্তরের গণহত্যা সম্পর্কে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার এবং মিথ্যা ছবি সংবলিত বই প্রকাশ করার পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান তাত্পর্যপূর্ণ। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা হিসেবে বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবিকে দমনের জন্য সংখ্যালঘু উর্দু সমর্থক কর্তৃপক্ষ বাঙালিদের ওপর গুলি চালিয়েছিল। বলা বাহুল্য, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল ধর্মীয় চেতনার অদ্ভুত ব্যাখ্যা! ভাষা আন্দোলনে শহীদ হয়েছিলেন রফিক, সালাম, জব্বারসহ অনেক বাঙালি। ভাষা আন্দোলনের ফলে স্বীকৃত ও প্রকাশ্য গৌরবোজ্জ্বল উপাদান, যা আমাদের অর্জনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেগুলো হল রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং শেখ হাসিনা সরকারের উদ্যোগে জাতিসংঘ কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রভৃতি। এগুলো আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে মহিমান্বিত করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ভাষা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত অসাম্প্রদায়িক বহুত্ববাদী চেতনার পরিস্থিতি নিয়ে।
বহুত্ববাদী চেতনা সংরক্ষণ করাই হচ্ছে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের প্রধানতম অন্তর্নিহিত ভাবার্থ। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেওয়ার সময় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণেও বাঙালি-অবাঙালি সবাইকে ভাই সম্বোধন করে তাদের সবার অধিকার সংরক্ষণের জন্য সতর্ক থাকতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। অর্থাত্ যদিও বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার লক্ষ্যেই এই আন্দোলনটি হয়েছিল কিন্তু এই আন্দোলনের লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছিল সংখ্যালঘু ভাষা উর্দুসহ অন্যান্য ভাষাকেও মর্যাদা দিতে হবে। আর বিশ্বে যখন অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের মাধ্যমে সেইসব ক্ষুদ্র ভাষার অস্তিত্ব টিকে থাকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আবার এটিও আমাদের লক্ষ করতে হবে যে সংস্কৃতির বহুত্ববাদী চেতনা সংরক্ষণের অন্যান্য অনেক তাত্পর্যের পাশাপাশি সব নৃ-গোষ্ঠী ও সব ধর্মাবলম্বীকে সংস্কৃতি সংরক্ষণকেও বোঝায়। এই যুক্তি অনুসারে আমরা বলতে পারি বর্তমান বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন তথা একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা বাস্তবায়নের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীদের জীবন, সম্পদ ও স্বাধীনতার ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা, জঙ্গি হামলা তথা জঙ্গিবাদ প্রভৃতি। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তান সৃষ্টির দ্বিজাতিতত্ত্ব তথা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের স্থানে ভাষার অধিকারভিত্তিক অসাম্প্রদায়িকতা তথা বহুত্ববাদী চেতনার ভিত্তিতেই স্বাধীন বাংলাদেশের রক্তাক্ত অভ্যুদয় সম্ভব হয়েছে। লক্ষ করার বিষয় হচ্ছে, ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য কোনো রক্ত বা জীবন বিসর্জন দিতে হয়নি। কিন্তু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে শুরু করে অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে রক্ত তথা লক্ষ লক্ষ প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। সহজ কথার উত্তর হচ্ছে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা-ভিত্তিক পাকিস্তান যারা রক্ষা করতে চেয়েছে তারাই বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামীদেরকে হত্যা করেছে, তারাই একাত্তরের গণহত্যা করেছে। এটিই প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু এই সত্যকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যর্থ রাষ্ট্র পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রের শেষ নেই। একটির পর একটি ষড়যন্ত্র করেই যাচ্ছে।

 বাংলাদেশে ধর্মীয় ও নৃ-গোষ্ঠীগত মানুষের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক হামলা এদেশে পাকিস্তানের অনুসারীদের সাম্প্রদায়িক হিংসামূলক তত্পরতার অংশ। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ধর্মীয় উপনিবেশ পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর থেকেই এর শাসকগোষ্ঠীর বিজাতীয় ও সাম্প্রদায়িক শোষণ এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি কর্মপন্থা নির্ধারণের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু চিন্তাভাবনা শুরু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচিতি পাওয়া যায় পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ারও আগে থেকে। ১৯৪৬ সালে সংঘটিত কলকাতা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামাতে বয়সে তরুণ শেখ মুজিব মহাত্মা গান্ধী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মিলে যে ভূমিকা রেখেছিলেন তা থেকেই তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা উপলব্ধি করা যায়। বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বলেছেন, ‘এই সময় শহীদ সাহেবের সাথে কয়েক জায়গায় আমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধীর সাথে শহীদ সাহেব হিন্দু-মুসলমান শান্তি কায়েম করার জন্য কাজ করেছিলেন।’ পরে সদ্য সৃষ্ট পাকিস্তান থেকে সাম্প্রদায়িক সমস্যার কারণে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর লোকজন যখন দেশত্যাগ শুরু করে তখন বঙ্গবন্ধুর চেষ্টা ছিল যাতে তারা দেশত্যাগ না করে। এজন্য বঙ্গবন্ধু ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি বললাম, এর (গণতান্ত্রিক যুবলীগের) কর্মসূচি হবে সাম্প্রদায়িক মিলনের চেষ্টা করা, যাতে কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা না হয়, হিন্দুরা দেশ ত্যাগ না করে-যাকে ইংরেজিতে বলে কমিউনাল হারমনি, তার জন্য চেষ্টা করা। অনেকেই এই মত সমর্থন করল ...।’ (পৃ. ৮৫)
 ধর্মীয় উপনিবেশ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক বাঙালিদের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক মনোভাবাপন্ন হীন সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর ক্ষোভ সম্পর্কে জানা যায় তাঁর বক্তব্যে। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হবার পরই আমার সন্দেহ হয়েছিল। কলকাতায় আমি বলেছিলাম, এ স্বাধীনতা মিথ্যা। এ স্বাধীনতা বাংলাদেশকে উপনিবেশ করেছিল।’ তবে দৃশ্যত ভাষা আন্দোলনই ছিল (পূর্ব) বাঙালিদের স্বাধীনতা ও মুক্তি সম্পর্কিত চিন্তার প্রথম বহির্প্রকাশ। ১৯৪৮ ও ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬-দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর ১১ দফাভিত্তিক গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও আদর্শ দ্বারা এদেশের মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়েছে। এমনকি ১৯৬২ সালে গোপালগঞ্জে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল, বঙ্গবন্ধুর চেষ্টায় তা বন্ধ হয়েছিল। প্রসঙ্গক্রমে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালিত্বের চেতনা এবং বাঙালির মুক্তি চেতনার বাহ্যিক প্রকাশ হিসেবে কতগুলো ঐতিহাসিক ও অসাম্প্রদায়িক স্লোগানের শব্দমালা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। যেগুলোর মধ্য দিয়ে বাঙালির মননে অসাম্প্রদায়িক স্বদেশ এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ‘সোনার বাংলা’ বিনির্মাণের প্রত্যয় প্রচ্ছন্নভাবে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছিল। এই স্লোগানগুলো হচ্ছে, ‘তুমি কে, আমি কে, বাঙালি বাঙালি’; ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ এবং ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি’। পাশাপাশি বাঙালিত্বের চেতনাবাহী ‘জয় বাংলা’ ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র! আর সবশেষে যখন, স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে বিশ্বকবির ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি ...’ নির্বাচিত করার সিদ্ধান্ত বঙ্গবন্ধু নিয়েছিলেন তখন অসাম্প্রদায়িক স্বদেশ ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়টির দৃঢ়তা ও গভীরতা সম্পর্কে সব সন্দেহ দূরীভূত হয়ে গিয়েছিল। 

যদিও তখন ছিল ঘোর অন্ধকারময় ধর্মীয় উপনিবেশ পাকিস্তানের জালিম শাহীর শাসন! বিশ্বে বাঙালিদের একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এইসব ঐতিহাসিক স্লোগানে যাঁরা কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর চেতনা ধারণ করে বিশ্বকবির লেখা সংগীত মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদেরকে উজ্জীবিত করেছিল তাদের প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তানপ্রেমী গুটিকয় বাঙালি কুলাঙ্গার! তাদের লক্ষ্য ছিল, পাকিস্তানি সৈন্যদের সক্রিয় সহায়তায় স্বাধীনতা ও মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত বাঙালিদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা’ দখলে রাখা! মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ বিন্যাস এভাবে করা যেতে পারে, এক পক্ষ ধর্মের গোঁড়ামিমুক্ত অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সুসংগঠিত, আর এর বিপক্ষ ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িক শাসন-শোষণ অব্যাহত রাখার জন্য ‘ক্ষমতা’ দখলে রাখতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত! অর্থাত্ ‘ধর্মীয় উপনিবেশ পাকিস্তান’ রাষ্ট্রের মধ্যে থেকে যেন বাঙালিরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় সেই ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি!
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাংস্কৃতিক পরিচিতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেন। ফলে বাঙালিদের সাধারণ স্বার্থ, সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িক স্বার্থকে বিতাড়িত করে। ‘বাঙালি’ শব্দটি বঙ্গবন্ধু প্রায়ই ব্যবহার করতেন। পরে সংবিধানে অসাম্প্রদায়িক-জাতীয়তাবাদ বোঝাতে ‘বাঙালি’ শব্দটি ব্যবহূত হতো। অন্য কথায় ‘বাঙালি’ শব্দটি তিনি সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী তথা অসাম্প্রদায়িকতা বোঝাতে ব্যবহার করেছেন। বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে সব ধর্মের অনুশীলনের সংযুক্ততা বুঝিয়েছেন, এদ্বারা সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধতা বুঝিয়েছেন। হূদয়ের এই সুগভীর অনুভূতিই তাঁকে বাংলা ও বাঙালির বন্ধু ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণের চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসমুদ্রে ‘হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, বাঙালি-অবাঙালি’ নির্বিশেষে বাংলাদেশের সবার উদ্দেশ্যে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-জনতা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। চূড়ান্ত ফলাফলে মুক্তিকামী বাঙালির বিজয় সূচিত হয়! কিন্তু এর জন্য যে মূল্য দিতে হয় তার নজির বিশ্ব ইতিহাসে বিরল! ত্রিশ লক্ষ তাজা প্রাণ, দুই লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রম পাশাপাশি বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের কয়েক সহস্র প্রশিক্ষিত সৈন্যের আত্মাহুতি-এসবের বিনিময়ে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়’ অর্জিত হয়েছিল! বিজয়ের পরে মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর সরকার পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করেছিলেন।

 ‘বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১-১৯৭৫’ শীর্ষক গ্রন্থে সংখ্যাগত ও গুণগত তথ্য-উপাত্তসহ বঙ্গবন্ধু সরকারের কর্মকাণ্ডের বিবরণ উপস্থাপন করা হয়েছে এভাবে-‘যুদ্ধপরবর্তী সরকারের অসংখ্য ইতিবাচক পদক্ষেপ আর্থসামাজিক জীবনে মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। এতদসত্ত্বেও বাঙালি জনগণের বিরুদ্ধে বহু আগে থেকে পরিচালিত সেই চিরন্তন ষড়যন্ত্রই প্রকাশ পেল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। তিনি যে বলেছিলেন, ষড়যন্ত্র এখনও চলছে তা-ই যথার্থ প্রমাণিত হল।’ ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর থেকে প্রায় দুই দশক দেশে প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে বঙ্গবন্ধুর অবদান বা আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ গ্রন্থে পঁচাত্তর পরবর্তী অবৈধ সরকারের শাসনামলে তত্কালীন পরিস্থিতির বর্ণনা করে বলা হয়েছে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর ঢাকা রেডিও থেকে শুধু বঙ্গবন্ধুবিরোধী কথা ও গান প্রচার করা হতো। এসব গানের রচয়িতা ও সংগীত পরিচালক ছিলেন পাকিস্তানের দোসর সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। তখন বঙ্গবন্ধুকে মানুষের হূদয় থেকে মুছে দেওয়ার জন্য দেশের মানুষকে শুধু তথাকথিত কাজ করার কথা বলা হতো। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর এসব অপচেষ্টা সত্ত্বেও মানুষের মন থেকে বঙ্গবন্ধুকে বিন্দুমাত্র মুছে ফেলা যায়নি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সুচিন্তিত পদক্ষেপের কারণে ইতোমধ্যে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের তত্পরতা প্রতিরোধ করার বেশ কিছু সফল উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের বহুত্ববাদী অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথে চলার কারণে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সমগ্র বিশ্বে আর্থসামাজিক উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই সাম্প্রদায়িক শক্তির ষড়যন্ত্রের ন্যক্কারজনক তত্পরতাও চলতে থাকার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। ২০১৭ সালের ভাষার মাসে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ সবাইকে সতর্ক থেকে সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় দৃঢ় শপথ নিতে হবে।
লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়  - See more at: http://www.shokalerkhobor24.com/details.php?id=61596#sthash.58pXW8rG.dpuf