বুধবার ১৭ জানুয়ারি, ২০১৮, সন্ধ্যা ০৭:২০

স্বপ্ন যাবে বাড়ি

Published : 2017-06-21 23:32:00
নিজস্ব প্রতিবেদক: রমজান এলেই ঈদের আমেজ শুরু হয়। মনে জেগে ওঠে বাড়ি ফেরার তাড়া। ইটকাঠের রাজধানীবাসীর মনে শুরু হয় রঙিন স্বপ্নের জাল বোনা। মা-বাবা, পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধবসহ শৈশবের ফেলে আসা দিনগুলো স্মৃতির বারান্দায় পায়চারি শুরু করে। পরিবারের সান্নিধ্যে থেকে ঈদ উদযাপন করা ছোট-বড় সবার একটি স্বপ্ন। যেখানে অনিঃশেষ হূদয়বাঁধন প্রতীক্ষায় থাকে। পরিবারের সদস্যদের মিলন আর ঈদ উদযাপন একাকার হয়ে যায়। দিন গোনা শেষে স্বজন-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার লক্ষ্যে বাড়ির পথে ছোটা শুরু হয়েছে।
দুয়ারে দাঁড়িয়ে আঁচলে চোখ মোছা প্রিয়জনকে রেখে জীবিকার খোঁজে যে শহরে আসা, ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে সে শহর ছাড়ায় উদ্বেল হয়ে উঠেছে সবার মন। চিরচেনা স্বজনদের মাঝে উপস্থিত হওয়ার আকুলতা তাই সব বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে কর্মস্থলকে পেছনে ফেলে-নাড়ির টানে সম্মুখপানে টেনে নিচ্ছে সবাইকে।
সারা বছরের দিন গোনা শেষে এখন রাজধানীবাসী শেকড়ের টানে পাড়ি জমাচ্ছে শৈশবের স্মৃতিময় ভিটায়। সড়ক, নৌ ও রেলপথ-সব পথেই বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে রাজধানীর লাখ লাখ মানুষ। তাদের চঞ্চলতায় সব টার্মিনাল এখন সরগরম। গত কয়েকদিন ধরে দিন-রাত লাইনে দাঁড়িয়ে সংগ্রহ করা টিকেট পকেটে পুরে, নতুন পোশাক ব্যাগবন্দি করে, চোখভরা আনন্দ নিয়ে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে এর বাসিন্দারা। যারা এখনও ঘরে ফেরার টিকেট হাতে পায়নি, তাদের চেষ্টা চলছে অবিরাম।
ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে গতকাল সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেনের মাধ্যমে ঈদের রেলযাত্রা শুরু হয়। এরপর চট্টগ্রামগামী সোনার বাংলা এক্সপ্রেস, কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে এগারসিন্দুর, চিলাহাটির উদ্দেশে নীলসাগর এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রী নিয়ে স্টেশন ত্যাগ করে ট্রেন। ঈদ উপলক্ষে নয় দিন আগে যারা ট্রেনের অগ্রিম টিকেট নিয়েছিল, তারা এ দিন যাত্রা শুরু করে।
সকালের ভাগে আগাম টিকেটের যাত্রীদের নিয়ে রাজধানী থেকে নির্ধারিত সময়ে ট্রেন ছেড়ে গেলেও কয়েক ঘণ্টা পার হতেই শুরু হয় শিডিউল বিপর্যয়। সিলেটের উদ্দেশে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস দুপুর ১২টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও একটি বগিতে সমস্যা থাকায় দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে ছেড়ে যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্দেশে রাজশাহী এক্সপ্রেস ১২টা ২০ মিনিটের বদলে দুপুর ২টায় স্টেশন ছাড়ে। ময়মনসিংহের উদ্দেশে ঈশাখাঁ এক্সপ্রেস বেলা সাড়ে ১১টায় ছাড়ার কথা থাকলেও দুপুর সোয়া ১২টায় ট্রেনটি স্টেশন ছাড়ে। চট্টলা এক্সপ্রেস দুপুর ১টায় চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দুপুর ২টা ৩৮ মিনিটে ট্রেনটি ছেড়ে যায়। এ ছাড়া রংপুর এক্সপ্রেস, রাজশাহীগামী সিল্কসিটি, চট্টগ্রামগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেস নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কিছুটা দেরিতে স্টেশনে পৌঁছার কারণে দেরিতে ছেড়ে যায়।
ট্রেনের সময়সূচি বিগড়ে যাওয়ায় যাত্রীরা ভোগান্তির অভিযোগ করেন।
কমলাপুর রেলস্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী সকালের খবরকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রেনের যাত্রা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন কারণে দুয়েকটা ট্রেন কিছুটা বিলম্বে ছেড়েছে। এটাকে শিডিউল বিপর্যয় বলা যাবে না। তবে পরবর্তী সময়ে সব ট্রেন যাতে নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যায় সেই চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, এবার টিকেটের জন্য কোনো হাহাকার নেই। যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত আসন আছে। যাত্রীরা যেমন নির্বিঘ্নে টিকেট পেয়েছেন তেমনি নির্বিঘ্নে ঘরে পৌঁছবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বছরের অন্য সময়ে বাড়ি যাওয়ার চেয়ে ঈদে বাড়ি যাওয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য। কত কত আবদার আর বায়না পূরণ অপেক্ষা করে এ উপলক্ষে। অনেকেই অল্প টাকার চাকরি করেন। ফলে সাধ্যের মধ্যে বাড়ির সবার জন্য জামা-কাপড়সহ প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই কিনতে হয়। প্রিয়জনদের সঙ্গে বছরের এই সময় দেশের বাইরে থেকেও অনেকে আসেন ঈদ উদযাপন করবেন বলে।
কমলাপুর রেলস্টেশনে কথা হয় চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতি ট্রেনের যাত্রী ইকরামুল হকের সঙ্গে। সপরিবারে ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছেন তিনি। তার হাতে একগাদা শপিং ব্যাগ।
জানতে চাইলে হাসিমুখে ইকরামুল বলেন, এবার বাড়ির সবার জন্য তো বটেই প্রতিবেশীদের জন্যও কেনাকাটা করেছি। বোনাসের টাকা শেষ, বেতনের টাকাও অর্ধেক খরচ হয়ে গেছে। এরপরও মনে হচ্ছে আরও কত কিছুই কেনা বাকি রয়ে গেছে।
কমলাপুর রেলস্টেশন ঘুরে দেখা যায়, প্রথম দিনে ট্রেনে যাত্রীর চাপ কম। তবে দাঁড়িয়ে যাওয়ার যাত্রী অন্য দিনের চেয়ে বেশি ছিল। টিকেট কাউন্টারগুলোতে স্বাভাবিক সময়ের মতোই ভিড়। কোনো কোনো কাউন্টারে ভিড় একেবারে নেই বললেই চলে।
ঘরে ফেরা মানুষকে বাস, ট্রেন বা লঞ্চের টিকেটপ্রাপ্তি থেকে শুরু করে বাড়ি পৌঁছানো পর্যন্ত কত না দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কিন্তু আপনজনদের কাছে পৌঁছামাত্র নিমেষেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। তাই তো শত বিড়ম্বনা সহ্য করেও ছুটছে সবাই আপন ঘরে।
এবার ঈদের সরকারি ছুটি ২৫ থেকে ২৭ জুন। তার আগে দুদিন শুক্র আর শনিবার থাকায় আজ অফিস শেষে ঈদযাত্রার মূল চাপ শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
রাজশাহীগামী সিল্কসিটি ট্রেনের যাত্রী সোহানা আফরিন বলেন, রাত জেগে লাইনে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট নিয়েছি। এখন ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কিন্তু বাড়ি যাওয়ার আনন্দে এসব কষ্ট কিছুই মনে হয় না।
স্টেশনে রাজশাহীগামী ট্রেনের জন্য স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন জিয়াউর রহমান। তার কাছে এবারে ঈদযাত্রা কেমন তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঈদের সময় কিছুটা দুর্ভোগ তো থাকবেই। সে তুলনায় এবার তেমন একটা সমস্যা হয়নি। ঈদের আগ পর্যন্ত এই অবস্থা থাকলেই ভালো।
পরামর্শ : রেল, বাস ও লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রা ও চলার পথে পাশের যাত্রী, অপরিচিত কোনো ব্যক্তি, হকার কিংবা ফেরিওয়ালার কাছ থেকে খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অভিহিত করে তা গ্রহণ থেকে সতর্ক ও সাবধান থাকার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ছুটিতে যারা গ্রামের বাড়িতে যাবেন তারা শহরের বাসার দরজা-জানালা ঠিকমতো লাগানো হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে নেবেন। রাতে বাসা বা দোকানের চারপাশ আলোকিত রাখার ব্যবস্থা করবেন। মূল্যবান দলিল ও মূল্যবান সম্পদ ব্যাংকের লকারে রাখতে হবে। ঈদের ছুটিতে যারা গ্রামের বাড়িতে যাবেন; তারা রাজধানীর বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকানপাটে যাতে চুরি, গণচুরি কিংবা গণডাকাতির মুখে না পড়ে সেজন্য আগে থেকেই দায়িত্ব পালনকারী দারোয়ান ও সিকিউরিটি গার্ডদের অবহিত করাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিপদের আশঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্ট থানা ও পুলিশ ফাঁড়িকেও অবহিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

 

আরও খবর