শুক্রবার ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮, সকাল ০৭:৪৯

সঙ্কটের মুখেও গ্যাস রফতানির সিদ্ধান্ত কেন

Published : 2017-02-23 00:21:00

আবদুল হাই রঞ্জু : বেশ কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানার উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। শুধু ব্যাহতই নয়, এতে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে আছে। প্রাকৃতিক গ্যাস আমাদের প্রধান খনিজ সম্পদ। একসময় বলা হতো, গ্যাসের ওপরে ভাসছে বাংলাদেশ। ফলে রাতারাতি ডিজেল ও পেট্রলচালিত যানবাহন কনভারশন করে গ্যাসে রূপান্তর করা হল। শুধু যানবাহনেই নয়, বিদ্যুত্ ও সার উত্পাদনেও গ্যাসের ব্যবহার অগ্রাধিকার পেল। 

এসব ঘটনার উত্পত্তি খুব বেশিদিনের নয়। যে বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন গ্যাসের ওপর বাংলাদেশ ভাসছে, এখন তারাই বলছেন গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে, গ্যাস ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে হবে। এই যদি হয় বাস্তবতা, তাহলে যত্রতত্র বিশেষ করে যানবাহন ও বাসাবাড়িতে গ্যাসের যথেচ্ছ ব্যবহার সঠিক হয়নি। বিলম্বে হলেও সে উপলব্ধি এখন দানা বেঁধে উঠেছে। বাধ্য হয়ে সরকার গ্যাস সঙ্কট মোকাবেলায় বিদেশ থেকে চড়া মূল্যে এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আবার নতুন করে দেশে কোনো গ্যাসক্ষেত্রেরও সন্ধান মিলছে না। যখন গ্যাসের ব্যবহার ও আমদানি, এমনকি গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলোয় গ্যাসের পরিবর্তে অন্য জ্বালানি ব্যবহারে উপযুক্ত করে তোলার কথা ভাবা হচ্ছে, তখন আবার বিদেশি কোম্পানিকে সরকার গ্যাস রফতানির সুযোগ দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেয় কীভাবে? অতিসম্প্রতি অনেক জাতীয় দৈনিকে ‘ফের বিদেশি কোম্পানিকে গ্যাস রফতানির সুযোগ’ শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়েছে। খবরটি যে উদ্বেগের, বলার অপেক্ষা রাখে না। 

তবে দেশের মানুষের সঙ্গে আমাদেরকেও ভাবিয়ে তুলছে, চরম সঙ্কটের মুখে সরকার বিদেশি কোম্পানিকে কোন যুক্তিতে গ্যাস রফতানির সুযোগ দিচ্ছে? যদিও সরকারের জ্বালানি বিভাগ বলছে, দিন দিন বাংলাদেশে গ্যাসের চাহিদা বেড়েই চলেছে। ফলে উত্পাদিত গ্যাস দেশের চাহিদা মেটাতেই ব্যবহার হবে। সঙ্গত কারণেই বিদেশি কোম্পানির অনুকূলে কখনই গ্যাস রফতানির সুযোগ হবে না। শুধু বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতেই আনুষ্ঠানিকতার জন্য এই সুযোগ রাখা হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগের এ ধরনের ব্যাখ্যা কতটা যৌক্তিক, তা হয়তো সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে আমাদের যতদূর মনে হয়েছে, যে বিদেশি কোম্পানিগুলো কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে গ্যাস উত্তোলন করবে, তারা তাদের স্বার্থ বাদ দিয়ে কি বিশাল এই কর্মযজ্ঞে বিনিয়োগ করবে? যা সহজভাবেই সমর্থন করা যায় না। যেখানে চুক্তিতে গ্যাস রফতানির সুযোগ রেখেই চুক্তি হয়েছে, সেখানে বাড়তি দামেই উত্তোলিত গ্যাস বিদেশি কোম্পানির নিকট থেকে বাংলাদেশকে কিনতে হবে। আর বাংলাদেশ রাজি না হলে তারা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী গ্যাস অন্য দেশে রফতানি করবে, এটাই স্বাভাবিক। কারণ গ্যাস রফতানির সুযোগ না রাখলে বিদেশি কোম্পানি চুক্তিতে রাজি হবে না, মূলত এজন্যই সরকারকে এই শর্তে রাজি হয়েই চুক্তি সম্পাদন করতে হয়েছে। আমরা বরাবরই দেখে আসছি, শুধু গ্যাসের ক্ষেত্রেই নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকার বিদেশিদের স্বার্থ রক্ষা করেই চুক্তি সম্পাদন করে থাকে। আসলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে আমাদেরকে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা উচিত। বরং জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে, এমন শর্তে বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই চুক্তি করা উচিত নয়।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালে নেদারল্যান্ডস দেশের স্থায়ী সালিশি আদালতের রায়ে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি হওয়ার পর সীমান্ত সংলগ্ন সমুদ্র থেকে ইতোমধ্যে মিয়ানমার অনুসন্ধান শেষে গ্যাস উত্তোলন শুরু করেছে। অথচ সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির ৪ বছর অতিবাহিত হলেও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ শুরু করতেই পারেনি। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, মিয়ানমার গ্যাস উত্তোলন শুরু করায় বাংলাদেশের গ্যাস ব্লকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যা নিয়ে ২০১৫ সালে দেশের গোয়েন্দা সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, বাংলাদেশের গ্যাস উত্তোলন অনুসন্ধান কাজের স্থবিরতার কারণে বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের সমূহ ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি গোয়েন্দা সংস্থাটি পরামর্শ দিয়েছিল, এ বিষয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে যথাযথ নজরদারির ব্যবস্থা করার। সূত্র মতে, বাংলাদেশ মিয়ানমার সমুদ্রসীমায় চারটি ব্লক সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। এর মধ্যে বিদেশি কোম্পানি ক্রিস এনার্জি ও সন্তোষকে যৌথভাবে একটি ব্লক ইজারা দিলেও আজ পর্যন্ত তারা কাজ শুরু করেনি। বাকি ৩টি ব্লক ইজারা দেওয়ার কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি। অথচ দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুদ দিনে দিনে ফুরিয়ে আসছে। মূলত গ্যাসকে ঘিরে ইতোমধ্যে যেসব শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে, সেগুলো এখন গ্যাসের অভাবে প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। যা মোকাবেলায় সরকার ব্যয়বহুল এলএন গ্যাস আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমনিতেই আমাদের দেশের শিল্পকারখানায় উত্পাদিত পণ্যের উত্পাদন খরচ বেশি। এর ওপর যদি এলএন গ্যাসে উত্পাদনের দিকেই আমাদের যেতে হবে, তাহলে উত্পাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে এবং বাড়তি মূল্যে যা ভোক্তাদের কিনতে হবে। এমনকি উত্পাদন খরচ বাড়লে বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকাও কঠিন হবে। সঙ্গত কারণেই খনিজ সম্পদের অনুসন্ধানকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

জানা গেছে, জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সাগরে গ্যাস ব্লকগুলো ইজারা দেওয়ার জন্য সরকার দ্বিতীয় মাত্রার জরিপ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। মূলত জরিপ করলে বোঝা যাবে, সাগরে কী পরিমাণ সম্পদ আছে, যা জানার পর বিদেশি কোম্পানিগুলোকে দরপত্রে অংশ নিতে আহ্বান করা হবে। কিন্তু অদ্যাবধি কার্যত তেমন কিছুই হয়নি। সম্প্রতি মন্ত্রণালয় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে দরপত্রের মাধ্যমে সমুদ্রের ব্লকগুলো ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সমঝোতার ভিত্তিতে বিশেষ আইনে সমুদ্র ব্লক ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে জ্বালানি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পরেই গভীর সমুদ্রের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে নির্ধারিত কিছু বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়া হবে। বিশেষ করে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার পর সমুদ্র ব্লক ডিএস-১০, ডিএস-১১, ডিএস-১৬ ও ডিএস-২১ হতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনে বিদেশি কিছু কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ প্রসঙ্গে জ্বালানি সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান একটি জটিল প্রক্রিয়া। এটি সময়সাপেক্ষেও বটে। 

ফলে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশেষ আইন ব্যবহার করে সমুদ্রের ব্লকগুলো ইজারা দিয়ে তেল-গ্যাস উত্তোলন করা হবে। কিন্তু জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ভূতাত্বিক অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতার কারণে খনিজ সম্পদ উত্তোলনে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে দেশে গ্যাস নেই। গ্যাস ফুরিয়ে গেছে। এসব বলে ব্যয়বহুল এলএনজির মতো জ্বালানি আমদানির দিকেই ঝুঁকে পড়ছে দেশ। তিনি আরও বলেন, আমলাদের ফাইল চালাচালির কারণে বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানে অগ্রগতি হচ্ছে না। আগের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকেই গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। নতুন করে গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের মতো কর্মতত্পরতার অভাবকে দায়ী করে তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী সব ব্লকে কাজ শুরু করেছে মিয়ানমার। বাংলাদেশের ব্লকগুলো ফেলে রাখা হয়েছে। অথচ মিয়ানমার গ্যাস উত্তোলন শুরু করলে অনেকাংশেই বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। বাস্তবে বাংলাদেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। এ দেশের আমলারাই বড় শক্তিধর। প্রশাসনিক ভাষায় যাদেরকে বলা হয় নির্বাহী। এই নির্বাহীরাই সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে ছড়ি চালায় সর্বত্রই। অনেক ক্ষেত্রে এসব নির্বাহীই নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতাধর মন্ত্রীদের। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ইচ্ছা থাকলেও দেশের স্বার্থে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। 

যারা সরকারপ্রধানের আস্থা অর্জনে সক্ষম হন এবং সেই শক্তিতেই নিজের মতো করে কাজ করেন। পরিণতিতে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর যেভাবে ঢোল-শহরত করে প্রচারণা চালানো হয়েছে, সেভাবে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এখন আর উপায় কী? দরপত্র ছাড়াই বিশেষ আইনে বা নির্বাহী আদেশে প্রধানমন্ত্রীকে সমুদ্র ব্লক সমঝোতার ভিত্তিতে ইজারা দেওয়ার অনুমোদন দিতে হবে। তা না হলে জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাবে।
অবশ্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে দেশের খনিজ সম্পদের অনুসন্ধান ও উত্তোলনের দিকে আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, বিদেশি কোম্পানির অনুকূলে ইজারার অর্থই হচ্ছে অসম শর্তে রাজি হওয়া। 

ফলে অনেক ক্ষেত্রেই জাতির স্বার্থ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও পেট্রোবাংলা যৌথ উদ্যোগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ ইতোমধ্যে হাতে নিয়েছে, যা এখনও সীমিত পর্যায়েই বিদ্যমান। অথচ বিদেশি কোম্পানি যা পারেনি, সেই কূপ দেশীয় প্রতিষ্ঠান খনন করে সফলতার নজিরও স্থাপন করেছে। তবুও আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার বদলে বিদেশি কোম্পানির অনুকূলেই সিদ্ধান্ত নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আর তা কেন করেন, যা দেশের মানুষ বুঝলেও কিইবা করার আছে? আবার গ্যাসের ভাণ্ডার ফুরিয়ে যাচ্ছে বলা হলেও গ্যাসক্ষেত্র চিহ্নিত করার তাগিদ যেখানে প্রবল, সেখানে সরকার বিদেশি কোম্পানিগুলোর দাবির মুখে গ্যাস রফতানির মতো আত্মঘাতী বিপদের পথেই পা বাড়িয়েছে। যদিও জ্বালানি বিভাগ বলছে, বিদেশি কোম্পানিগুলোকে শুধু আকৃষ্ট করার স্বার্থেই গ্যাস রফতানির শর্তে রাজি হতে হয়েছে। যেখানে গ্যাসের তীব্র সঙ্কট, সেখানে গ্যাস রফতানির সিদ্ধান্ত বিদেশি কোম্পানির আস্থা অর্জনের জন্য নেওয়া হয়েছে। এ কথার কোনো ভিত্তি নেই। কারণ গ্যাসের চাহিদা পূরণ করতে বিদেশিদের কাছ থেকে চড়া দামে গ্যাস কিনতে সরকারকে বাধ্য করবে। বিদেশি কোম্পানিগুলোও এই উপলব্ধি থেকেই গ্যাস রফতানির শর্ত রেখেই বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু নীতি-নৈতিকতা, দেশের স্বার্থ কিংবা আদর্শিক কোনো কারণেই গ্যাস রফতানি সমর্থনযোগ্য নয়। গ্যাস রফতানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। - See more at: http://www.shokalerkhobor24.com/details.php?id=60529#sthash.F6ywXAei.dpuf