শুক্রবার ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮, ভোর ০৫:৫৬

আগামী নির্বাচনে আ’লীগের জয়ের টার্গেট ১৮০ আসন: সবুজ সঙ্কেত পাচ্ছেন ২৫ নতুন মুখ

Published : 2017-06-20 23:34:00
লায়েকুজ্জামান: আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ দুটি। আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করে বিএনপিকে নির্বাচনে আনা এবং সে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া। নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা ওই দুই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এগোচ্ছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর অশান্ত দেশকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে এনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের মেয়াদও শেষ করে এনেছেন। তবে সরকারের কপালে একটি কালোদাগ জ্বলজ্বল করছে, তা হল বিএনপির ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন ও বিনাভোটে ১৫৩ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া। আগামী নির্বাচনে এ কালোদাগ মুছে ফেলতে চায় আওয়ামী লীগ।
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগের ১৮০ আসনে জয় নিশ্চিত করতে চান। এই টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে তিনি কোনো প্রকার ঝুঁকি নিতে নারাজ। নির্বাচনে জিতে আসার ঝুঁকিতে আছেন এমন অর্ধডজন কেন্দ্রীয় ডাকসাইটে নেতাও এবার ছিটকে পড়তে পারেন। আবার আসন নিশ্চিত করতে নৌকার প্রার্থী হিসেবে দেখা যেতে পারে বিএনপির বেশ কয়েক গুরুত্বপূর্ণ নেতা, আমলা, সাবেক সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তা, শিল্পপতি ও প্রবাসী ধনাঢ্য ব্যক্তিকে। সূত্র জানায়, বর্তমান সংসদে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ২৩৪ জন। তাদের মধ্যে মাত্র ৪০-৪৫ জন আছেন যারা নিশ্চিন্তে জিতে আসতে পারবেন। বাকিরা নানা কারণে এলাকার ভোটার ও কর্মীদের কাছে বিতর্কিত হয়েছেন।
সরকারের তিনটি গোয়েন্দা সংস্থা, বাছাই করা দলীয় কর্মীদের একটি জরিপ দল, পেশাদার দুটি জরিপ সংস্থা ও আমলাদের একটি দলের জরিপ প্রতিবেদনে উঠে আসা চিত্র পর্যালোচনা করছেন স্বয়ং দলীয় প্রধান।
আগামী নির্বাচনে শতভাগ নিশ্চিত জিতে আসার মতো প্রার্থী বাছাইয়ের পাশাপাশি ওই সব এলাকার বর্তমান এমপির জনবিচ্ছিন্নতা ও আগামী নির্বাচনে কেন পরাজিত হতে পারেন তার কারণও জমা পড়ছে দলীয় নেত্রীর কাছে।
শেখ হাসিনার অধীনে হলেও বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে-এমন হিসাব মাথায় রেখেই দলীয় মনোনয়ন ছক কষছেন আওয়ামী লীগ প্রধান। সূত্র মতে, এবার নির্বাচনী কৌশলও বদল হচ্ছে, তিনশ’ আসনে সম গুরুত্বের বদলে টার্গেট করা হচ্ছে নিশ্চিত জয়ের আসনগুলো। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত রূপ পাবে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর। তার আগে সম্ভাব্য সব প্রার্থী ও বর্তমান সংসদের এমপিদের এলাকায় গিয়ে কাজ করার কথা বলা-ই অব্যাহত রাখবেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, কিছু আসনে আগেভাগেই নিশ্চিত জিতে আসার মতো বেশ ক’জন নতুন মুখকে সবুজ সঙ্কেত দেওয়া হতে পারে, যাতে তারা এলাকায় পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। এসব নতুন মুখের মধ্যে আছেন পেশাজীবী নেতা, সাবেক পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তা, আমলা ও রাজনৈতিক নেতা। আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির এক ডজন নেতার সঙ্গে বিশেষ মহলের নিবিড় যোগাযোগ চলছে। জাতীয়ভাবে এরা বড় নেতা না হলেও তাদের স্ব স্ব নির্বাচনী এলাকায় জনপ্রিয় এবং সহজে এমপি হয়ে আসার মতো। বৃহত্তর কুমিল্লায় দেখা যেতে পারে বিএনপি থেকে আসা বেশ কয়েকজন নতুন মুখ। সূত্রটি বলছে, আগামী নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে মুন্সীগঞ্জের একটি আসন থেকে লড়তে পারেন দেশময় আলোচিত একটি পরিবারের সন্তান। বর্তমানে যাদের পরিচিতি বিএনপি ঘরানার লোক হিসেবেই।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে ইতোমধ্যেই মাঠে নেমেছেন পুলিশের সাবেক আইজি নূর মোহাম্মদ। চাকরি জীবনে সুনামের অধিকারী নূর মোহাম্মদ এলাকার মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্য। চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি আসনে বর্তমান সরকারের সচিব জিল্লার রহমান আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচন করবেন বলে এলাকার তৃণমূল পর্যন্ত চাউর হয়ে গেছে। এলাকার বর্তমান এমপি অনেকটাই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তার বিপরীতে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করা ও তার পারিবারিক অবস্থানের কারণে এলাকায় এগিয়ে আছেন জিল্লার রহমান।
ফেনী-১ আসনে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন দুই শিল্পপতি। তাদের মধ্যে রয়েছেন কনকা গ্রুপ ও এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নূর নেওয়াজ সেলিম ও এনা পরিবহনের মালিক খন্দকার এনায়েতুর রহমান। তাদের মধ্যে যেকোনো একজন পেতে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগের সবুজ সঙ্কেত। ফেনী-৩ আসনে আওয়ামী লীগের নতুন মুখ ম্যানপাওয়ার ব্যবসায়ী, যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা আবুল বাশার। নির্বাচনী এলাকায় দলমত নির্বিশেষে সব মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সহযোগিতা করার কারণে তিনি এলাকার সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য মানুষ হিসেবে পরিচিত।
ঝালকাঠি-১ আসনে বিগত আট বছর ধরে লেগে আছেন ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা মনিরুজ্জামান মনির। রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটিতে রাজনীতির কেন্দ্র হচ্ছে রাজাপুর। মনিরুজ্জামানের বাড়ি রাজাপুর সদরে হওয়া ও এলাকায় ব্যাপক গোষ্ঠী এবং পারিবারিক প্রভাব থাকায় এলাকার রাজনীতি এবার তিনি সহজে নিয়ন্ত্রণে নিতে পেরেছেন। বিএনপির শাহজাহান ওমরকে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে মনিরুজ্জামান মনিরকেই যোগ্য প্রার্থী ভাবা হচ্ছে।
রাজবাড়ী-২ আসনে সবুজ সঙ্কেত পেতে যাচ্ছেন স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদের সভাপতি বিএমএর সাবেক মহাসচিব ডা. ইকবাল আর্সলান। ব্যক্তি জীবনে নিরেট সত্ মানুষ হিসেবে পরিচিত ইকবাল আর্সলান পাংশার এক জমিদার পরিবারের সন্তান। তাদের পরিবারটি এলাকায় খ্যাত হয়ে আছে বিশাল পারিবারিক ভূ-সম্পত্তি এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণসহ মানব কল্যাণে দান করে। মুসলিম ঐতিহ্যের ধারক এ পরিবারের এক সময়ের কর্তা ইকবাল আর্সলানের দাদা কাজী আবদুল মাজেদ এলাকায় দাঙ্গার সময়ে সংখ্যালঘুদের পক্ষে দাঁড়ানোর কারণে পরিবারটি আজও সংখ্যালঘুদের কাছে যেমন প্রিয় হয়ে আছে, তেমনি এলাকার গোঁড়া মুসলিম হিসেবে বিবেচিত ভোটাররাও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। সূত্র মতে, সে কারণে আসনটি নিশ্চিত করতে ডা. ইকবাল আর্সলানকে বেছে নিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে ডা. ইকবালের মরহুম পিতা ডা. আসজাদ আয়ুব খানের দেওয়া খেতাব প্রত্যাখ্যান করে, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর একবার জামায়াতের সমর্থনে নির্বাচন করেছিলেন। পরে রাজনীতি থেকে ঘোষণা দিয়ে সরে দাঁড়ান তিনি।
রাজবাড়ী-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী আলী নেয়াজ খৈয়মকে মোকাবেলা করতে এবার বেগ পেতে হতে পারে আওয়ামী লীগকে। নতুন মুখের বিকল্প নেই-এমনটাই বলা হয়েছে একাধিক প্রতিবেদনে। সে ক্ষেত্রে দলীয় রাজনৈতিক বিত্তের বাইরেও একাধিক সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে নিজের ভিতকে শক্ত করে তুলেছেন কাজী এরাদত আলী। এ আসনে নতুন এক সম্ভাব্য প্রার্থী নিজেকে নিশ্চিত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিলেও মাত্র অল্প কয়েক দিন মেয়রের দায়িত্ব পালন করে গোটা পরিবার নিয়ে লুটপাটে জড়িয়ে ইতোমধ্যেই নির্বাচনী এলাকায় নিজেকে বিতর্কিত করে ফেলেছেন।
সূত্র মতে, চট্টগ্রাম-১১ আসনে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে পারেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি, সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা খোরশেদ আলম সুজন। নির্বাচনী এলাকায় লেগে থেকে তিনি নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পেরেছেন।
চট্টগ্রাম-১২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে পারেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ। আওয়ামী লীগের নিশ্চিত বিজয়ের জন্য প্রতিবেদনে তার কথা বলা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লা বলেছেন, সব দলের অংশগ্রহণে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হলে প্রার্থী বদল হতে পারে, নতুন মুখ আসতে পারে। প্রতিটি নির্বাচনে এমন হয়। এছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্রে আসন বড় ফ্যাক্টর। সব দলই চায়, নির্বিঘ্নে জিতে আসতে পারে এমন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে।

 

আরও খবর