সোমবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, 7:58
চাকরি খুঁজব কেন? চাকরি দেব
Published : Thursday, 12 January, 2017 at 12:00 AM, Update: 12.01.2017 1:04:11 AM, Count : 62
আমি যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি তখন আমাদের এলাকার সোনার বাংলা লাইব্রেরির সকল গল্প-সাহিত্য-উপন্যাস, যা বিক্রয়ের জন্য রাখা ছিল তা পড়ে শেষ করেছিলাম (আরব্য রজনীর মতো উপন্যাসও এর মধ্যে ছিল)। অষ্টম শ্রেণিতে উঠে থানা পাবলিক লাইব্রেরির সদস্য হই। দশম শ্রেণিতে এই লাইব্রেরির সব বই পড়ে ফেলি। তখন আমাদের থানা শহরে ঢাকা থেকে পত্রিকা আসত দুই দিন পরে, অর্থাত্ আঠারো তারিখের পত্রিকা বিশ তারিখে দুপুরের পর পেতাম। শফিক রেহমানের যায়যায়দিন সাপ্তাহিক ট্যাবলয়েড হিসেবে বের হতো। তার একটি কলাম ছিল ‘দিনের পর দিন’, যা আমার অতি প্রিয় ছিল।
মিলা ও তার প্রেমিকের টেলিফোনের আলাপচারিতার মাধ্যমে শফিক রেহমান বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয়ের অবতারণা করতেন। কোনো এক সংখ্যায় মিলা তার প্রেমিককে বলছিলেন মালয়েশিয়ার তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনে নবীন গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য। আমার মনে পড়ে তিনি বলছিলেন, গ্র্যাজুয়েটরা তোমরা প্রথমে চাকরি করবে নামিদামি কোম্পানিতে, পারলে বহুজাতিক কোম্পানিতে। ন্যূনতম পনের বছর দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে কাজ করবে। ন্যূনতম দুই বছরের পরিবারের ভরণপোষণের অর্থ জমা রেখে ও অর্থসংস্থানের পথ সুগম করে ব্যবসায়ের ঝুঁকি নেবে!
এই কথাটির প্রতিফলন দেখেছি আমার জীবনে পঁচিশ বছর পরে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি থাইল্যান্ডের রাজার জন্মোত্সবে রাজকীয় মেহমান হিসেবে যোগ দেওয়ায়। সেখানে আমি দেখা পাই ডিস্টিচ মাতেশ্চজের সঙ্গে। তিনি আমার বন্ধু ও বিজনেস কম্পেটিটর সদ্য প্রয়াত চালেও অভিযোধ্যার বিজনেস পার্টনার ছিলেন।
আমাদের পাশাপাশি রুমে থাকার ব্যবস্থা ছিল। তিন দিন আমরা রাজকীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পাশাপাশি আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক আলোচনায় মত্ত ছিলাম। আলোচনাতে উঠে এসেছে তার রেডবুল এনার্জি ড্রিঙ্ক ব্যবসার উদ্যোগ গ্রহণের ইতিহাস-সাফল্যের ইতিহাস।
মাতেশ্চজ স্কুলজীবনের আট-দশজনের মতো সাধারণ ছাত্র ছিলেন। দশ বছর কলেজে পড়ার পর আটাশ বছর বয়সে মার্কেটিংয়ে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি চাকরিতে যোগ দেন। জাকবস ও ইউনিলিভার কোম্পানিতে অনেক বছর দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে কাজ করেন এবং প্রক্টর ও গ্যাম্বলার নামক কোম্পানিতে মার্কেটিং ডিরেক্টর হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। এই পদে আসীন হওয়ার পর তিনি দুনিয়া ঘোরার সুযোগ পান। আর তার এই দুনিয়া ঘোরার সুযোগটি ছিল রেডবুলের জন্মগ্রহণের কারণ।
চাকরির প্রয়োজনে মাতেশ্চজ কোনো একদিন থাইল্যান্ডে এলেন। তখন তিনি দোকানে একটি এনার্জি ড্রিঙ্কের বোতল দেখতে পেলেন। এই বোতলটি তাকে অনেক আকর্ষণ করল। এতই আকর্ষণ করল যে এটা তার পেশাকে বদলে দিল। তিনি ওই এনার্জি ড্রিঙ্কের মালিকের সঙ্গে দেখা করলেন। তাকে বোঝাতে সমর্থ হলেন যে এটা অনেক বড় ব্যবসার সুযোগ হতে পারে দুনিয়াব্যাপী।
তারা ১৯৮৪ সালে পাঁচ লাখ ডলার দিয়ে ব্যবসা শুরু করলন এবং ১৯৮৭ সালে তা পূর্ণতা পেল। প্রথম দিকে কেউই এই পানীয় কিনতে চাইত না। কিন্তু মাতেশ্চজ একজন মার্কেটিংয়ের গ্র্যাজুয়েট ছিলেন এবং অনেক বছর মার্কেটিংয়ের ওপর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন বহুজাতিক কোম্পানিতে বহুমাত্রিক কাজ করে। তার পাওয়ারফুল মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজির কারণে আস্তে আস্তে বাজারে এ পানীয় গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছিল। তিনি কী করেছিলেন জানেন?
অস্ট্রিয়াতে হাতে বানানো যন্ত্র দিয়ে মানুষ উড়ত এবং ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতার মতো প্রতিযোগিতা করত। তিনি এই প্রতিযোগিতাতে স্পন্সর করলেন। এতে ভালো রেসপন্স পেলেন। বুঝতে পারলেন এটা স্পোর্টস সিগমেন্টে ভালো করবে। তাই তিনি বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের স্পোর্টসে স্পন্সর করলেন। ১৯৯২ সালে রেডবুল অস্ট্রিয়া ও এর আশপাশের দেশগুলোতে ঘরে ঘরে জনপ্রিয়তা পেল। আর মাত্র পাঁচ বছর পর ১৯৯৭ সালে রেডবুল উত্তর আমেরিকাতেও বাজার দখল করল। বর্তমানে রেডবুল ১৬০টিরও বেশি দেশে চার বিলিয়নের ওপরে ক্যান বিক্রি করে। এই দুই অংশীদার পৃথিবীর ধনীদের মধ্যে গণ্য। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ চার বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
বর্তমানে বাংলাদেশে একটি অতি সস্তা স্লোগানের জনপ্রিয়তা দেখে আমি ওপরের প্রসঙ্গগুলো অবতারণা করলাম। স্লোগানটা হল”‘চাকরি খুঁজব কেন? চাকরি দেব।’ যে নবীন গ্র্যাজুয়েটমাত্রই গ্র্যাজুয়েশন করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হল-যার বাস্তব দুনিয়া সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। যার নিজের অর্থ আয়ের কোনো নিশ্চয়তা এখনও হয়নি, সে কীভাবে চাকরি দেবে? আমি মনে করি, এটা আমাদের নবীন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ধোঁকা। এটা নবীন গ্র্যাজুয়েটদেরকে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে। তাই আমি মাতেশ্চজের জীবন ইতিহাস ও ড. মাহাথির মোহাম্মদের সুরে সুর মিলিয়ে বলতে চাই, সদ্য পাস করা গ্র্যাজুয়েটরা প্রথমেই চাকরি করবে। অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। পাঠ্যপুস্তকে যা পড়ে এসেছে তা বাস্তবে প্রয়োগ করবে। দাফতরিক অবকাঠামোর মধ্য দিয়ে কাজের ঘোরপ্যাঁচগুলো শিখবে। কর্মশৃঙ্খলা (ডিসিপ্লিন) শিখবে। কর্মক্ষেত্রে বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করা শিখবে। নিজের কর্ম ও দক্ষতার ওপর আত্মবিশ্বাস (কনফিডেন্স) তৈরি করবে, অর্থাত্ যা করছি তার মাধ্যমে সাফল্য আসছে এবং যা করব তার মাধ্যমে সাফল্য আসতে বাধ্য।
মনে রাখবেন যদি বারো থেকে পনের বছরের বাবস্থাপকীয় (সধহধমবত্রধষ) কাজের অভিজ্ঞতা থাকে, এটি শুধু আপনার ব্যবসার উন্নতির জন্য কাজে লাগবে না, আপনার ব্যাকআপ হিসেবেও কোনো সময় কাজে লাগতে পারে। কোনো কারণে আপনার ব্যবসা যদি গুটাতে হয় সেক্ষেত্রে আবার আপনি কর্মবাজারে (লড়ন সধত্শবঃ) ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করতে পারবেন।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে পঁচানব্বই ভাগ নবীন উদ্যোক্তাই ব্যর্থ হয়েছেন! দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে সস্তা জনপ্রিয় বিষয়গুলো অতি তাড়াতাড়ি জনপ্রিয় হয়। কেউ কিন্তু বলে না এই নবীন উদ্যোক্তারা ব্যর্থ হলে তারা এরপরে কী করবে। কেউ বলে না এই নবীন উদ্যোক্তারা ব্যর্থ হলে তাদের পড়ালেখার খরচ যারা জুগিয়েছেন তাদের কী হবে। চরম সত্য হল, হাজার হাজার তরুণ উদ্যোক্তা ব্যর্থ হলে বেকার হয়ে যাবে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের পরিবারগুলোও ধ্বংস হয়ে যাবে।
অতএব, নিরাপদে খেলাই ভালো। এটি সবার জন্য মঙ্গল। আমার এই ভাবনা হয়তোবা জনপ্রিয়তা পাবে না কিন্তু এটি অনুসরণ করলে অনেক পরিবারকে রাস্তায় নামতে হবে না।
লেখক : একটি বহুজাতিক কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা ahirul@shell-bd.com



« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : কমলেশ রায়
প্রকাশক রোমো রউফ চৌধুরী কর্তৃক সকালের খবর ভবন (৮ম ও ৯ম তলা), ২৫ কমরেড মনি সিংহ সড়ক (৬৮ পুরানা পল্টন), ঢাকা-১০০০ হতে প্রকাশিত।, দৈনিক সকালের খবর পাবলিকেশনস লিমিটেড, ১৫৩/৭ তেজগাঁও বা/এ, ঢাকা-১২০৮ হতে মুদ্রিত, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক দফতর : ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক সকালের খবর, ২০১৬
ফোন : +৮৮-০২-৮১৭০৫৬৮-৭০, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৮১৭০৫৭২
ই-মেইল : Print : dsknews@shokalerkhabor.com, Online : onlinenews@shokalerkhabor.com